Wednesday, 20 July 2011

আ.লীগ নেতা তাহেরের ছেলে বিপ্লবের দণ্ড মওকুফ, আরও দুটি হত্যা মামলায় যাবজ্জীবন খুনিকে রাষ্ট্রপতির ক্ষমা



লক্ষ্মীপুর পৌরসভার মেয়র ও আওয়ামী লীগের বিতর্কিত নেতা আবু তাহেরের ছেলে এ এইচ এম বিপ্লবের ফাঁসির দণ্ডাদেশ মওকুফ করেছেন রাষ্ট্রপতি।
লক্ষ্মীপুর জেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও আইনজীবী নুরুল ইসলাম হত্যা মামলার রায়ে ২০০৩ সালে আদালত বিপ্লবের মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেন। আরও দুটি হত্যা মামলায় বিপ্লবের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছে। তিনি লক্ষ্মীপুর জেলা কারাগারে আটক আছেন।
দীর্ঘ ১০ বছরের বেশি সময় পলাতক থেকে বিপ্লব গত ৪ এপ্রিল আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। এরপর তাঁর বাবা আবু তাহের ছেলে বিপ্লবের প্রাণভিক্ষা চেয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান বিপ্লবের সাজা মওকুফ করেন। গত ১৪ জুলাই এই সাজা মওকুফের আদেশ কার্যকর হয়।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকার আমলে ২০০০ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর রাতে লক্ষ্মীপুর শহরের বাসা থেকে নুরুল ইসলামকে অপহরণের পর হত্যা করা হয়। এটি তখন দেশজুড়ে আলোচিত ঘটনা ছিল। তখন সেখানকার পৌর চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবু তাহেরও সন্ত্রাসের ‘গডফাদার’ হিসেবে ব্যাপক আলোচনায় ছিলেন।
২০০৩ সালে এই মামলার রায়ে বিপ্লবসহ পাঁচ আসামির মৃত্যুদণ্ড ও নয়জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ দেন বিচারিক আদালত।
বিপ্লবের মৃত্যুদণ্ডাদেশ মওকুফসংক্রান্ত একটি চিঠি গতকাল মঙ্গলবার নুরুল ইসলাম হত্যা মামলার বিচারিক আদালত চট্টগ্রাম বিভাগীয় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে পৌঁছায়। চিঠিটি পাঠিয়েছেন লক্ষ্মীপুর জেলা কারাগারের তত্ত্বাবধায়ক নুরশেদ আহমেদ ভুইয়া। চিঠিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্মারক নং ‘কারা শাখা-২-এর পি-২০/২০১১(অংশ)/২৭০, তারিখ ১১/০৭/২০১১’ এবং কারা অধিদপ্তরের স্মারক নং ‘পিডি/পরি/৭/২০১১/১৬৭৫(৩), তারিখ ১৭/০৭/২০০১’-এর বরাত দিয়ে বলা হয়, ‘উপরোক্ত বিষয় ও সূত্রোক্ত স্মারকের আলোকে মহোদয়ের সদয় অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে যে, বিষয়োক্ত বন্দিকে বিভাগীয় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল, চট্টগ্রাম-৪৮/২০০৩ মামলায় মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত বন্দির পিতা কর্তৃক ছেলের প্রাণভিক্ষার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য রাষ্ট্রপতি “মৃত্যুদণ্ড মওকুফ করা হলো” লিখে স্বাক্ষর করেছেন। তাই সংশ্লিষ্ট বন্দি গত ১৪/০৭/২০১১ তারিখে মৃত্যুদণ্ড হতে খালাস পেয়ে অন্য মামলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত বন্দি হিসেবে বর্তমানে অত্র কারাগারে আটক আছে।’
গতকাল বিকেলে মুঠোফোনে জানতে চাইলে লক্ষ্মীপুর জেলা কারাগারের তত্ত্বাবধায়ক নুরশেদ আহমেদ ভুইয়া প্রথম আলোকে বলেন, ‘মহামান্য রাষ্ট্রপতি একটি মামলায় বিপ্লবের মৃত্যুদণ্ড মওকুফ করেছেন। সেই আদেশ অনুযায়ী আমরা ব্যবস্থা নিয়েছি।’ তিনি বলেন, আরও দুটি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হওয়ায় বিপ্লব কারাগারে বন্দী আছেন।
কী বিচার পেলাম: বিপ্লবের ফাঁসির দণ্ড মওকুফের খবর জানিয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে নুরুল ইসলামের স্ত্রী রাশিদা ইসলাম গত রাতে প্রথম আলোকে বলেন, ‘তাহলে আমরা কী বিচার পেলাম? আমার বাচ্চারা কী বিচার পেল? একটা স্বাধীন দেশে যদি খুনি ক্ষমা পেয়ে যায়, তাহলে আর কী বলব! শুধু কষ্ট হয়। এই খুনির ক্ষমা হয় কীভাবে?’
রাশিদা ইসলাম বলেন, ‘এখন তো আমি নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত। কারণ, সে তো একজন খুনি। সে শুধু একটা খুন করেনি, আরও অনেক খুন করেছে। এখন আমরা কার কাছে নিরাপত্তা চাইব?’
হত্যা, মামলা ও বিচার: স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, আবু তাহের ও তাঁর ছেলেদের নেতৃত্বে সন্ত্রাসী বাহিনীর নানা অপরাধমূলক তৎপরতার কারণে লক্ষ্মীপুর ‘সন্ত্রাসের জনপদ’ নামে ব্যাপক পরিচিতি পায়। ওই সময় সেখানকার বেশির ভাগ বিএনপির নেতা-কর্মী হামলা ও মামলার মুখে এলাকাছাড়া ছিলেন। নুরুল ইসলাম ছিলেন তখন বিএনপির জেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক। তিনি আইনজীবী হিসেবে এলাকায় অবস্থান করে বিএনপির নেতা-কর্মীদের মামলা পরিচালনা করতেন। আর তাঁর স্ত্রী-সন্তান ঢাকায় থাকতেন।
২০০০ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর রাতে লক্ষ্মীপুরের পৌর এলাকার মজুপুরের বাসা থেকে নুরুল ইসলামকে অপহরণ করা হয়। এরপর আর তাঁর সন্ধান মেলেনি। পরদিন থেকে এটা দেশজুড়ে আলোচিত ঘটনা ছিল। এ ঘটনা নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করায় ‘গডফাদার’ আবু তাহের ‘সাংবাদিকদের হাত-পা ভেঙে মেঘনা নদীতে ফেলে দেওয়ার’ হুমকি দিয়ে সমালোচিত হয়েছিলেন।
মামলার নথিপত্র অনুযায়ী, পরবর্তী পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে আসে, তাহেরের তিন ছেলে বিপ্লব, লাবু ও টিপুর নেতৃত্বে নুরুল ইসলামকে অপহরণ করা হয়। ওই রাতেই তাহেরের বাসায় তাঁর স্ত্রী নাজমা তাহেরের উপস্থিতিতে নুরুল ইসলামকে জবাই করা হয়। এরপর লাশ টুকরো টুকরো করে বস্তায় ভরে মেঘনা নদীতে ফেলে দেওয়া হয়।
এ ঘটনার পরদিন লক্ষ্মীপুর জেলা আইনজীবী সমিতির তৎকালীন সভাপতি এইচ এম তারেক উদ্দিন মাহমুদ বাদী হয়ে সদর থানায় একটি অপহরণ মামলা করেন। ওই মামলার এজাহারে কোনো আসামির নাম উল্লেখ ছিল না।
এ ঘটনার ১০ দিন পর বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্বে বিএনপির সাংসদদের একটি দল লক্ষ্মীপুরে যায় এবং ৩৭ জন আসামির নাম উল্লেখ করে পুলিশ সুপারের কাছে মামলার একটি এজাহার জমা দেয়। কিন্তু পুলিশ বিএনপির মামলা নেয়নি। আগের এজাহার বহাল রাখে।
২০০১ সালের ১ অক্টোবরের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বিএনপি ক্ষমতায় এলে মামলার তদন্তের নতুন মোড় নেয়। ২০০২ সালের ৩০ জুলাই আবু তাহের, তাঁর স্ত্রী নাজমা, তিন ছেলেসহ ৩১ জনকে আসামি করে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ।
মামলাটি তখন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মনিটরিং সেলে পাঠানো হয়। সেখান থেকে ২০০৩ সালের ৩ সেপ্টেম্বর মামলার নথি আসে চট্টগ্রাম বিভাগীয় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে। এরপর শুরু হয় বিচার কার্যক্রম।
আদালত তৎকালীন জেলা প্রশাসক মাহবুবুল আলম, পুলিশ সুপার ইরফান আলীসহ ৩৯ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করেন।
২০০৩ সালের ৯ ডিসেম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল এ মামলার রায় দেন। তাতে তাহেরের তিন ছেলেসহ পাঁচ আসামির মৃত্যুদণ্ড ও নয়জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়। তাহের ও তাঁর স্ত্রী নাজমাসহ তিনজন খালাস পান। বিপ্লব এই মামলার পর থেকে পলাতক ছিলেন।
কারা সূত্র জানায়, গত এপ্রিলে বিপ্লব লক্ষ্মীপুরের আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। এরপর গত ১৯ মে সকালে লক্ষ্মীপুর কারাগার থেকে একটি মাইক্রোবাসে করে পুলিশ পাহারায় বিপ্লবকে চট্টগ্রাম বিভাগীয় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।
এ ছাড়া বিএনপির কর্মী কামাল হত্যা মামলায় চট্টগ্রাম বিভাগীয় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল বিপ্লবের অপর দুই ভাই এ কে এম সালাহ উদ্দিন টিপু ও আবদুর জব্বার লাবলু ওরফে লাবুর মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন। কামাল হত্যা মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয় আবু তাহের, তাঁর বড় ছেলে বিপ্লব ও দলীয় কর্মী খালেক, বাবর এবং মারজুর। পরে বিপ্লব ও খালেক ছাড়া বাকি চারজন হাইকোর্ট থেকে খালাস পান।
বিএনপির কর্মী কামালকে ২০০০ সালে হত্যা করা হয়।

Thursday, 7 July 2011

লাগামহীন নিত্যপণ্যের বাজার






সৈয়দ মিজানুর রহমান
বাজারে এক কেজি চিনির খুচরা দর ৬৭ থেকে ৬৯ টাকা ছুঁয়েছে। এক লিটার বোতলজাত সয়াবিনের মূল্য ১২৫ থেকে ১৩০ টাকা। লুজ সয়াবিন বেড়ে হয়েছে ১১০ থেকে ১১৫ টাকা লিটার। মোটা চালের দর বেড়ে এখন বিক্রি হচ্ছে ৩৩ থেকে ৩৪ টাকা কেজি। রোজার আগেই ছোলার কেজি ৭০ থেকে ৭৩ টাকা। বাড়ছে পেঁয়াজ, রুসন ও আদার দর। ব্রয়লার মুরগি, ডিম, রুইমাছ ও ইলিশের সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারের কোনো সম্পর্ক নেই। তবু এগুলোর দরও বাড়ছে সমান তালে। নিত্যপণ্যের বাজার যেন বেসামাল। এদিকে বাজার নিয়ন্ত্রণে পণ্য আমদানিতে শুল্ক প্রত্যাহার ও হ্রাস, টিসিবি’র মাধ্যমে ন্যায্যমূল্যে পণ্য বিক্রি, মনিটরিং কমিটি গঠন, পর্যালোচনা ও পূর্বাভাস সেল গঠনসহ বেশ কিছু উদ্যোগের কথা জানিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। তবে এসব উদ্যোগের কিছুই কাজে আসেনি। সুফল পায়নি ক্রেতা-ভোক্তারা। সরকারি প্রতিষ্ঠান ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) দেয়া তথ্যে দেখা গেছে, ২০০৬ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের তুলনায় মহাজোট সরকারের আমলে বর্তমানে বেশিরভাগ নিত্যপণ্যের মূল্যই দ্বিগুণ বেড়েছে। বিগত জরুরি সরকারের তুলনায়ও কোনো কোনো পণ্যের দর বর্তমানে বেশি। চাল, ডাল, তেল, চিনি, আটা, ময়দা, পেঁয়াজ, রসুন, গুঁড়োদুধ, মাছ, মাংস, ব্রয়লার মুরগি, ডিম, লবণসহ সব ধরনের পণ্যের বাজারই এখন নিয়ন্ত্রণহীন। লাগামহীনভাবে এসব পণ্যের মূল্য বাড়লেও, বাজারে যেমন সরকারের কোনো মনিটরিং ব্যবস্থাও নেই, তেমনি দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখতে কার্যকর কোনো ভূমিকাও নেই সরকারের। ভোজ্যতেল : বাজারে লুজ বা খোলা সয়াবিনের দর বর্তমানে প্রতি লিটার ১১০ থেকে ১১৫ টাকা। পাম অয়েল মেশানো এসব সয়াবিনের ক্রেতারা সাধারণত নিম্নআয়ের মানুষ। তবে উন্নত মানের লুজ সয়াবিনের দর প্রতি লিটার ১২০ টাকা বলে জানিয়েছেন রাজধানীর কারওয়ান বাজারের তেল বিক্রেতারা। আবার বোতলজাত সয়াবিন বিক্রি হচ্ছে বর্তমানে প্রতি লিটার ১২৫ থেকে ১৩০ টাকা দরে। টিসিবি’র হিসাবে গত এক বছরের ব্যবধানে সয়াবিনের দর বেড়েছে গড়ে ৫০ শতাংশ। টিসিবি জানায়, গত ২০০৬ সালের এই সময়ে বাজারে প্রতি লিটার লুজ সয়াবিন বিক্রি হয়েছে ৪৮ টাকা দরে। জোট সরকারের তুলনায় সয়াবিনের দর বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি। বাজারে বর্তমানে প্রতি লিটার পাম অয়েল বিক্রি হচ্ছে ৯৭ থেকে ১০২ টাকা দরে। নিম্নমানের এসব পাম অয়েল সাধারণত সাবান তৈরির নামে বাংলাদেশে আমদানি হয়। তবে সুপার পাম অয়েলের দর বর্তমানে প্রতি লিটার ১০৫ টাকা। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, সুপার পাম অয়েলই মূলত খাবার তালিকায় ভোজ্যতেল হিসেবে আমদানি হয়। তবে আমদানিতে সুপার পাম অয়েলের পরিমাণ খুবই কম। টিসিবি’র বাজার দর তথ্যে দেখা গেছে, গত এক বছরে পাম অয়েলের দর বেড়েছে ৪৩ শতাংশ। তবে ২০০৬ সালে বাজারে প্রতি লিটার পাম অয়েল বিক্রি হতো ৩৯ থেকে ৫২ টাকা লিটার, যা বর্তমানে দ্বিগুণেরও বেশি দরে বিক্রি হচ্ছে। চিনি : খুচরা বাজারে এক কেজি চিনি বিক্রি হচ্ছে বর্তমানে ৬৭ থেকে ৬৯ টাকায়। পাড়া-মহল্লার দোকানে চিনির দর ৭০ টাকা ছুঁয়েছে। তবে টিসিবি’র রোববারের বাজার দর তথ্যে দেখানো হয়েছে কারওয়ান বাজার, নিউমার্কেট, হাতিরপুল বাজারসহ বেশ কিছু বাজারে চিনির খুচরা দাম ৬৪ থেকে ৬৫ টাকা। টিসিবি’র হিসাবে গত এক মাসেই চিনির দর বেড়েছে শতকরা হিসাবে সাড়ে ৭ ভাগ। এক বছরের ব্যবধানে চিনির দাম বৃদ্ধির হার ৫০ শতাংশ। ১৯৯৬ সাল থেকে গতকাল পর্যন্ত টিসিবির বাজার দর পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, গতকালই এ যাবত্কালের সর্বোচ্চ রেকর্ড ছুঁয়েছে চিনির দাম। টিসিবি জানায়, ১৯৯৬ সালে বাজারে প্রতি কেজি চিনির দর ছিল সর্বনিম্ন ২৯ টাকা ও সর্বোচ্চ ৪২ টাকা। ’৯৭-এ চিনি বিক্রি হয়েছে ২৯ থেকে ৩৬ টাকা দরে, ’৯৮-এ ৩১ থেকে ৩৪ টাকা, ’৯৯-এ ৩১ থেকে ৩৩ টাকা, ২০০০ সালে ৩০ থেকে ৩৭ টাকা, ২০০১ সালে ৩০ থেকে ৩৩ টাকা, ২০০২ সালে ২৯ থেকে ৩৪ টাকা, ২০০৩ সালে ২৮ থেকে ৩৬ টাকা, ২০০৪ সালে ২৮ থেকে ৩৪ টাকা, ২০০৫ সালে খুচরা বাজারে প্রতি কেজি চিনি বিক্রি হয় ৩০ থেকে ৫০ টাকা দরে। ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শুরুর দিকে চিনির দাম ছিল প্রতি কেজি ২৭ থেকে ৩৭ টাকা। ২০০৮ সালে চিনি বিক্রি হয় ২৯ থেকে ৪৩ টাকা। বর্তমান সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের দিন (৬ জানুয়ারি ২০০৯) চিনির দর ছিল ৩০ থেকে ৩৩ টাকা কেজি। ছোলা : রোজার আগেই এ বছর ছোলার দর অস্বাভাবিক বেড়ে গেছে। বর্তমানে বাজারে প্রতি কেজি ছোলা বিক্রি হচ্ছে ৭০ থেকে ৭৩ টাকা দরে। রাজধানীর রহমতগঞ্জের পাইকারি ছোলা বিক্রেতারা জানিয়েছেন, বাজার ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা এবং সরকারের কোনো নজরদারি না থাকায় পাইকারি বাজারের তুলনায় খুচরা বাজারে প্রতি কেজিতে ১০ থেকে ১২ টাকা বেশি দরে বর্তমানে ছোলা বিক্রি হচ্ছে। রহমতগঞ্জের সুমন ডাল বিতানের মালিক ও বাংলাদেশ ডাল ব্যবসায়ী সমিতির সহ-সভাপতি নেসার উদ্দিন গতকাল আমার দেশকে জানিয়েছেন, পাইকারি বাজারে গতকাল উন্নতমানের প্রতি কেজি ছোলার দর ছিল ৫৯ থেকে ৬০ টাকা। নিম্নমানের ছোলা বিক্রি হয়েছে ৫৭ থেকে ৫৮ টাকা। তবে টিসিবির বাজার দর তথ্যে বলা হয়েছে, রোববার প্রতি কেজি ছোলার খুচরা মূল্য ছিল ৭০ টাকা। টিসিবি জানিয়েছে, গত এক মাসে ছোলার দর বেড়েছে ৮ দশমিক ৩৩ শতাংশ। এক বছরের ব্যবধানে ছোলার দাম বৃদ্ধির হার ৪১ দশমিক ৩০ শতাংশ। ২০০৬ সালের এই সময়ে টিসিবির বাজার দর তথ্যে দেখা গেছে, প্রতি কেজি ছোলার দাম ছিল ৩৫ টাকা। ব্রয়লার মুরগি প্রতি কেজি ১৪৫ টাকা : কোনো কারণ ছাড়াই ব্রয়লার মুরগির বাজার ঊর্ধ্বমুখী। টিসিবি জানিয়েছে, গত ১২ জুন থেকে কয়েক দফা দাম বেড়েছে ব্রয়লার মুরগির। গতকাল রাজধানীর বাজারে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হয়েছে ১৪৫ থেকে ১৫৫ টাকা দরে। শতকরা হিসাবে গত এক মাসে ব্রয়লার মুরগির মূল্য সাড়ে ১২ শতাংশ বেড়েছে বলে জানিয়েছে টিসিবি। বাজারে যেমন ব্রয়লার মুরগির দাম বেড়েছে, তেমনি দেখা দিয়েছে সঙ্কটও। চাহিদার অর্ধেক ঘাটতির কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) সূত্রে জানা গেছে, ২০০৬ সালে খুচরা দামে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হয়েছে গড়ে ৮১ টাকা ৪৫ পয়সা দরে। তবে সে বছর ৭০ টাকা দরেও ব্রয়লার মুরগি কিনে খেয়েছেন ক্রেতা-ভোক্তারা। ২০০৭ সালে ব্রয়লার মুরগির দাম কিছুটা বেড়ে ৮৯ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়। ২০০৮ সালে গড়ে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগির দর ছিল ১০৫ টাকা। অন্যদিকে সরকারি বাজার তদারকি প্রতিষ্ঠান ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) জানিয়েছে, বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের দিন ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি বাজারে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি (ফার্মের মুরগি) বিক্রি হয়েছে ১০০ টাকা দরে (খুচরা দাম)। সে দিন বাজারে দেশি মুরগির দর ছিল প্রতি কেজি ২০০ টাকা। ব্রয়লার মুরগির দর চড়া থাকায় দাম বেড়েছে দেশি মুরগির।ডিম : দেশে ডিম আমদানি হয় না। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে ডিমের দাম বাড়ল কি কমল তার হিসাব করে স্থানীয় বাজারে দাম বাড়া বা কমার কথা নয়। তবে গত এক মাস ধরেই বেজায় চড়া ডিমের দর। টিসিবির হিসাবেই গত এক মাসে ডিমের দাম বেড়েছে ৯ শতাংশ। তবে বাজার ঘুরে জানা গেছে, গত এক মাসে ডিমের দর বেড়েছে অন্তত ১৫ থেকে ১৬ শতাংশ।গতকাল রাজধানীর বাজারে প্রতি হালি ফার্মের ডিমের দর ছিল ২৭ থেকে ২৯ টাকা। ২০০৬ সালের ডিসেম্বরে রাজধানীর কারওয়ান বাজার, নিউমার্কেট, হাতিরপুল বাজার, মৌলভীবাজার, ঠাঁটারিবাজার, সূত্রাপুর, ফকিরাপুল, মোহাম্মদপুর কৃষি বাজারসহ বিভিন্ন খুচরা বাজারে প্রতি হালি দেশি মুরগির ডিমের দাম ছিল ১১ থেকে ১২ টাকা। এখন একই ডিমের দাম ৩২ থেকে ৩৪ টাকা হালি। ফার্মের ডিমের দাম ২০০৬ সালের ডিসেম্বরে ছিল ১১ টাকা।রোজার আগেই চড়া মাছ-মাংসের বাজার : রোজার মাসে সাধারণত মাছ ও মাংসের বাজার কিছুটা চড়া থাকে। তবে এ বছর রোজার এক/দেড় মাস আগেই মাছ-মাংসের বাজার চড়া। বাজারে বর্তমানে এক কেজি গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে ২৭০ থেকে ২৮০ টাকা কেজি। দুই বছরে এক কেজি গরুর মাংসের দাম বেড়ে গেছে ৭০ থেকে ৮০ টাকা পর্যন্ত। খাসির মাংস বিক্রি হচ্ছে এখন ৪৬০ থেকে ৪৮৫ টাকা কেজি দরে। দুই বছরে এক কেজি খাসির মাংসের দর বেড়েছে প্রায় ৯৫ টাকা। বাজারে এক কেজি রুই মাছের দাম এখন ২৫০ থেকে ২৭০ টাকা পর্যন্ত। ২০০৯ সালের শুরুর দিকে বাজারে রুই মাছ বিক্রি হয়েছে দেড়শ’ টাকা কেজি দরে। রুই মাছের দর গত দুই বছরে প্রতি কেজিতেই বেড়েছে প্রায় ১১০ টাকা পর্যন্ত। এই হিসাব ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) দেয়া। বাড়ছে চালের দর : চালের ভরা মৌসুমে প্রতি কেজি সরু জাতের মিনিকেট, নাজিরশাইল চাল বিক্রি হচ্ছে ৪২ থেকে ৫০ টাকায়। টিসিবি’র দেয়া তথ্যানুযায়ী এক বছরের ব্যবধানে এ চালের দাম বেড়েছে ১০ ভাগ। মাঝারি মানের পাইজাম, লতাশাইল চাল বিক্রি হচ্ছে ৩৮ থেকে ৪২ টাকায়। এক বছরে বেড়েছে ৮ দশমিক ৯৬ ভাগ। মোটা চাল স্বর্ণা ও চায়না ইরি বিক্রি হচ্ছে ৩২ থেকে ৩৪ টাকায়। এক বছরে এ চালের দাম বেড়েছে প্রায় ৫ ভাগ। ভেস্তে গেছে বাজার নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ : নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নেয়া উদ্যোগ ইতোমধ্যে ভেস্তে গেছে। বর্তমান মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পরই এ উদ্যোগ নেয়া হয়। এগুলো হচ্ছে—কিছু পণ্যের আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক প্রত্যাহার ও হ্রাস, টিসিবির মাধ্যমে ন্যায্যমূল্যে পণ্য বিক্রি, বাজার ব্যবস্থাপনা জোরদার করতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে মনিটরিং কমিটি গঠন, স্থায়ীভাবে দ্রব্যমূল্য পর্যালোচনা ও পূর্বাভাস সেল গঠন, আমদানিকারকদের আমদানিতে উত্সাহিতকরণ, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধ্যাদেশ জারি এবং ঢাকা শহরে চারটি কাঁচাবাজার স্থাপন। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সরকারের এসব উদ্যোগের অনেকগুলোই চালু হয়েছে। তবে কার্যত এর কোনো সুফল পায়নি ক্রেতা-ভোক্তারা। শুল্ক হ্রাসের সুযোগ প্রায় পুরোটাই নিয়েছে ব্যবসায়ীরা।
এছাড়া নিত্যপ্রয়োজনীয় ৯টি পণ্যের সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতি মনিটরিং করতে ইতোমধ্যে ‘কোর ফুড বাস্কেট’ গঠন করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এসব পণ্যের মধ্যে রয়েছে চাল, ডাল, তেল, আটা, গুঁড়োদুধ, লবণ, চিনি, আলু ও পেঁয়াজ। এর মধ্যে চারটি পণ্য চাল, ডাল, ভোজ্যতেল ও গম স্পর্শকাতর পণ্য বলে এগুলোর ব্যাপারে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয় বলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল। তবে এসবের কিছুই কাজে আসেনি। বাজারে বাড়ছে নিত্যপণ্যের মূল্য।

Wednesday, 29 June 2011

দেশের আইনি ব্যবস্থা আজ রাহুগ্রস্ত : বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান



স্টাফ রিপোর্টার

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান বলেছেন, ‘দেশের আইনি ব্যবস্থা এখন রাহুগ্রস্ত। নানাভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এর চর্চা। এ অবস্থার উত্তরণ ঘটাতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘তবে আমাদের হতাশ হওয়া উচিত নয়।’উপজাতি আইন বিষয়ক ‘কমপেনডিয়াম অন ন্যাশনাল অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল ল’স অ্যান্ড ইনডিজিনিয়াস পিপলস ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক গ্রন্থের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে তিনি একথা বলেন। সাবেক প্রধান বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান সদ্য প্রকাশিত বই সম্পর্কে বলেন, ‘যেসব সমস্যা নিয়ে এ বই প্রকাশিত হয়েছে সেসব সমস্যা সারাবিশ্বেই রয়েছে। আদিবাসী বা উপজাতিদের ভূমির ১৬ আনা মালিকানা নিয়ে যে কথা হচ্ছে তা দেয়া সম্ভব নয়। ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগতভাবে কেউই ভূমির ১৬ আনা মালিকানা দাবি করতে পারে না।’কাপেং ফাউন্ডেশন ও অক্সফাম জিবি আয়োজিত এ প্রকাশনা অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন রবীন্দ্রনাথ সরেন। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি এস কে সিনহা এবং সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট জেড আই খান পান্না। বইটি সম্পাদনা করেছেন ব্যারিস্টার রাজা দেবাশীষ রায়, অ্যাডভোকেট প্রতিকার চাকমা ও অ্যাডভোকেট শিরিন লিরা। গতকাল সকালে রাজধানীর পরিকল্পনা একাডেমি মিলনায়তনে এ প্রকাশনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।সাবেক প্রধান বিচারপতি উপজাতিদের ভূমির ১৬ আনা দাবি প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ার উদাহরণ দেন। তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের আদিবাসী বা উপজাতিদের ভূমি অধিকার নিয়ে ২০০ বছর ধরে একাধিক আইন হয়েছে। কিন্তু এখনও নানা সমস্যা রয়েছে। অস্ট্রেলিয়ায়ও এ বিষয়ে আইন হয়েছে। কিন্তু তা কার্যকর করা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। তিনি বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে বিষয়টি নয়ে নতুন করে বিরোধ সৃষ্টি না করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘আমাদের সমঝোতার চেষ্টা করতে হবে।’বিচারপতি এস কে সিনহা প্রকাশিত গ্রন্থ সম্পর্কে বলেন, ‘এটি আইনের বই নয়, ইতিহাস। পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর ‘গ্লিমসেস অব ওয়ার্ল্ড হিস্ট্রি’ বইয়ের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ‘এ বইটি যেমন মানব সভ্যতার ইতিহাস, আজকে প্রকাশিত বইটিও আদিবাসীদের ইতিহাস। বইটিতে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের কথা যেমন রয়েছে, তেমনি সমতল ভূমির আদিবাসীদের কথাও সংযোজন করতে হবে। তিনি বলেন, অনেক আদিবাসী ধর্মান্তরিত হয়ে খ্রিস্টান, বৌদ্ধ হয়েছে। তাদের পারিবারিক সম্পত্তির আইন কেমন হবে সে বিষয়টিও ভাবতে হবে। অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশ আদিবাসীদের অধিকারের স্বীকৃতি দিয়েছে। বর্তমান বাংলাদেশ সরকারও তা করবে বলে আশা করছি।রাজা দেবাশীষ রায় বলেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রথাগত আইন ছাড়াও পারিবারিক আইন রয়েছে। সারাদেশে যে আইন রয়েছে এ অঞ্চলে তা প্রয়োগ করা যায় না। পার্বত্য অঞ্চলে দেওয়ানি কার্যবিধি প্রযোজ্য নয়। তিনি বলেন, পার্বত্য চুক্তির ফলে যে আইন প্রণীত হয়েছে তার কিছু কিছু নিয়ে হাইকোর্টে প্রশ্ন উঠেছে। এ বিষয়ে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে। সংবিধান সংস্কার কমিটি যেসব প্রস্তাব উপস্থাপন করেছে সেখানে মন্দও রয়েছে, ভালোও রয়েছে। তিনি দুঃখ করে বলেন, সংবিধানেআদিবাসীদের উপজাতি বলা হয়েছে। এটা গ্রহণযোগ্য নয়। আদিবাসী যদি নাই বলা যায় তাহলে সম্মানজনক কিছু বলা হোক। তিনি বলেন, সংবিধান সংশোধন কমিটিতে একজন আদিবাসীকেও রাখা হয়নি।অ্যাডভোকেট জেড আই খান পান্না বলেন, ‘আদিবাসী ও বাঙালি জাতি গোষ্ঠী উভয়ের জন্যই এ বইটি কাজে দেবে। আমরা সংখ্যাধিক্যের সুযোগে যেন অন্য কোনো গোষ্ঠীর ওপর যেন আইন চাপিয়ে না দেই।
অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে অক্সফাম প্রতিনিধি সৈকত বিশ্বাস বক্তৃতা করেন।

শেওড়াপাড়া ও সাভারে ৩ গার্মেন্টে শ্রমিক অসন্তোষ : আহত অর্ধশত : সড়ক অবরোধ, গাড়ি ভাংচুর, আটক ১৩













স্টাফ রিপোর্টার

রাজধানীর মিরপুর থানার শেওড়াপাড়ায় গতকাল সকালে গার্মেন্ট শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে কমপক্ষে ১০ শ্রমিক আহত হয়েছে। আহতদের মধ্যে মিনা ও সুলতানার অবস্থা গুরুতর। তাদের স্থানীয় ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়েছে। সংঘর্ষের সময় বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা কমপক্ষে ৮টি গাড়ি ভাংচুর করেছে। ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ ৫ গার্মেন্ট শ্রমিককে আটক করেছে। এদিকে গতকাল সাভারে দুটি গার্মেন্টে শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। পুলিশের হামলায় আহত হয়েছে অর্ধশত। আটক করা হয়েছে ৮ জনকে। পুলিশ জানায়, বিভিন্ন দাবি নিয়ে শেওড়াপাড়ার এস কিউ গার্মেন্টের কয়েক হাজার শ্রমিক গতকাল সকাল সাড়ে ৮টার দিকে রাস্তায় নেমে আসে। তারা রাস্তা অবরোধ করে। বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা ওই রাস্তায় চলাচলকারী কমপক্ষে ৮টি যানবাহন ভাংচুর করেছে। এ সময় পুলিশ শ্রমিকদের সরিয়ে দিতে গেলে পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের সংঘর্ষ হয়। শ্রমিকরা লাঠিসোটা নিয়ে পুলিশের ওপর চড়াও হয়। ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। মিরপুর থানার ওসি কাজী ওয়াজেদ আলী জানান, গার্মেন্ট শ্রমিকদের অবরোধের কারণে ওই সড়কে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা পুলিশের ওপর চড়াও হলে সামান্য লাঠিচার্জ করে শ্রমিকদের রাস্তা থেকে সরিয়ে দেয়া হয়। সকাল ১১টার দিকে পুলিশের চেষ্টায় পরিস্থিতি শান্ত হয়ে আসে। ঘটনাস্থল থেকে ৫ শ্রমিককে আটক করেছে পুলিশ। সাভার প্রতিনিধি জানান, সাভারে গতকাল দুটি রফতানিমুখী পোশাক তৈরি প্রতিষ্ঠান কবিরপুর এলাকার ত্বো-হা টেক্সটাইল ও কলমা এলাকার হট ড্রেস লিমিটেডে শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। বকেয়া বেতন-ভাতাসহ বিভিন্ন দাবিতে ত্বো-হা টেক্সটাইলের বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা নবীনগর-কালিয়াকৈর সড়ক এক ঘণ্টা অবরোধ করে রাখে এবং হট ড্রেস লিমিটেডের শ্রমিকরা কর্মবিরতি পালন করে। শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে উভয় পক্ষে অর্ধশত আহত হয়েছে। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে ৮ শ্রমিককে আটক করেছে। কারখানা দুটি কাল পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।শ্রমিক ও পুলিশ সূত্র জানায়, সাভারের কবিরপুর এলাকার ত্বো-হা টেক্সটাইল কারখানার শ্রমিকরা বকেয়া বেতন-ভাতা আদায়ের লক্ষ্যে গতকাল দুপুরে কারখানার ভেতর কর্মবিরতি ও বিক্ষোভ করে। পরে কারখানা কর্তৃপক্ষ বকেয়া বেতন চলতি মাসের ১৫ তারিখে দেয়ার ঘোষণা করলে শ্রমিকরা উত্তেজিত হয়ে পড়ে। এ সময় বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা কারখানার ভেতরে ভাংচুর চালিয়ে নবীনগর-কালিয়াকৈর মহাসড়কে অবস্থান নেয়। আড়াইটা থেকে সাড়ে তিনটা পর্যন্ত কারখানাটির প্রায় ছয় হাজার শ্রমিক অবরোধ করে রাখে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে শ্রমিকদের ব্যাপক লাঠিচার্জ করে। শ্রমিকরাও পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। উভয় পক্ষে সংঘর্ষ বেধে যায় এবং ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। অতিরিক্ত শিল্পাঞ্চল ও আশুলিয়া থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, পুলিশের প্রহারে অন্তত ৩৫ জন আহত হয়েছে। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে ৮ শ্রমিককে আটক করেছে। কারখানাটি শনিবার পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। অপর ঘটনায় সাভারের কলমা এলাকার হট ড্রেস লিমিটেড পোশাক কারখানার শ্রমিকরা পিস রেট বৃদ্ধি, বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধ, বেতনের অর্ধেক ঈদ বোনাস, এপিএম নাহিদের অপসারণ ও শ্রমিক নির্যাতন বন্ধসহ ১৪ দফা দাবিতে কর্মবিরতি ও বিক্ষোভ করে। বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা প্রতিষ্ঠানের হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা নূর মোহাম্মদ, ডিভিশনাল কর্মকর্তা গোলাম সরওয়ারসহ ৫ জনকে পিটিয়ে রক্তাক্ত জখম করে। খবর পেয়ে সাভার থানা পুলিশ ও শিল্পাঞ্চল পুলিশের কর্মকর্তারা এসে শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনা করেন। পরে কারখানার জেনারেল ম্যানেজার রফিকুল ইসলাম কাল পর্যন্ত কারখানাটি বন্ধ এবং রোববার কারখানাটি খোলা ও বেতন পরিশোধের ঘোষণা দিলে শ্রমিকরা শান্ত হয়।জালিয়াত গ্রেফতার : ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ জালিয়াতির মাধ্যমে হাইকোর্ট থেকে জামিন নেয়ার ঘটনায় মহিউদ্দিন আজাদ রাব্বী নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করেছে। বুধবার রাত পৌনে ১২টায় ডিবি পুলিশ বাড্ডা এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করে।ডিবির ডিসি (দক্ষিণ) জানান, গত বছরের ২৪ মার্চ গুলশানে ব্যবসায়ী সাদিকুর রহমান দম্পতি খুন হন। ওই খুনের আসামি রুবেল ও মিথুন চলতি বছরের ১১ জানুয়ারি জালিয়াতির মাধ্যমে হাইকোর্ট থেকে জামিন নিয়ে গা-ঢাকা দেয়। এই জালিয়াতচক্রের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে মহিউদ্দিন আজাদ রাব্বীকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে ডিবি পুলিশ জানায়।
উল্লেখ্য, জোড়া খুনের ঘটনায় মহিউদ্দিন আজাদ রাব্বী চার্জশিটভুক্ত আসামি। গত ৬ জুন আদালত রুবেল ও মিথুনকে মৃত্যুদণ্ড ও অন্যজনকে যাবজ্জীবন সাজা এবং মহিউদ্দিন আজাদকে অব্যাহতি দিয়ে রায় ঘোষণা করেছেন।

Tuesday, 31 May 2011

ক্ষমতা তোষণে ‘স্বাধীন’ দুদক










অলিউল্লাহ নোমান

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এখন সরকারের ভিন্নমত হয়রানির হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। কাগজে-কলমে স্বাধীন হলেও ক্ষমতাসীনদের তোষণ করাই যেন দুদকের মূল কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিনাটেন্ডারে কোটি কোটি টাকার কাজ বরাদ্দ দেয়া, সরকারি দলের লোকদের টেন্ডারবাজি, শেয়ারবাজার থেকে কোটি কোটি টাকা পাচার হয়ে যাওয়া—কোনো কিছুই দুদকের নজরে নেই। এসব কিছু দুদক পর্যবেক্ষণও করছে না। দুদকের নজরে নেই সরকারি দলের সদস্যদের সন্দেহজনক সম্পদ। অপরদিকে সরকারের বিভিন্ন কাজের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণকারীদের সন্দেহজনক সম্পদের খোঁজে দুদক ব্যস্ত রয়েছে। দুর্নীতির ছিটেফোঁটা অভিযোগ নেই এমন ব্যক্তিদেরও সম্পদের হিসাব চেয়ে নানাভাবে হয়রানি করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে বেনামি চিঠি আমলে নিয়ে, কখনও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে পাঠানো চিঠির সূত্র ধরে সম্পদের হিসাব বিবরণী চাওয়ার ঘটনাও রয়েছে। শুধু সম্পদের হিসাব চেয়ে চিঠি নয়, হয়রানি করা হচ্ছে মামলা দিয়েও। ক্ষমতার তোষণ করতেই বা সরকারের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের হাতিয়ার হিসেবে এসব কাজ করছে ‘স্বাধীন’ দুদক।
খোদ দুদক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান দৈনিক আমার দেশকে বলেন, বিনাটেন্ডারে কোনো কাজ দেয়া হচ্ছে বা টেন্ডারে দুর্নীতি হচ্ছে এমন কোনো বিষয় দুদকের নজরে বা পর্যবেক্ষণে নেই। এ ধরনের কোনো অভিযোগও তাদের কাছে কেউ দায়ের করেনি। সরকারের কেউ কোনো দুর্নীতি করছে বলে দুদকের জানা নেই। এ ধরনের কোনো অভিযোগ পাওয়া গেলে দুদক বিবেচনা করে দেখবে বলে উল্লেখ করেন দুদক চেয়ারম্যান।
শেয়ারবাজার থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার হয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে দুদক তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেবে কি-না জানতে চাইলে দুদক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান আমার দেশকে জানান, শেয়ারবাজারের বিষয়টি দুদকের তফসিলভুক্ত অপরাধ নয়। এছাড়া তদন্ত কমিটির রিপোর্টও আনুষ্ঠানিকভাবে দুদকের কাছে সরকার পাঠায়নি। দুদক চেয়ারম্যান বলেন, শুনেছি অর্থমন্ত্রী বিভিন্ন মিডিয়ায় বক্তব্যে জানিয়েছেন দুদকের কাছে দুটি মামলা পাঠাবেন। এখনও পাঠাননি। দুদকের কাছে কোনো মামলা পাঠালে, তফসিলভুক্ত অপরাধ হলে অবশ্যই তদন্ত করা হবে। তবে এখনও এ ধরনের কোনো কিছু তাদের কাছে নেই বলে উল্লেখ করেন দুদক চেয়ারম্যান। এজন্য শেয়ারবাজার থেকে টাকা ওঠানোর বিষয়ে দুদকের আপাতত কিছু করণীয় নেই। সন্দেহজনক সম্পদের ধারণা থেকে সরকারের সিদ্ধান্তের সঙ্গে ভিন্নমতের লোকদের সম্পদের হিসাব চেয়ে চিঠি বা মামলা দায়ের প্রসঙ্গে দুদক চেয়ারম্যানের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি কিছুটা ইতস্তত করে বলেন, সন্দেহজনক সম্পদের বিষয়ে দুদক কোনো চিঠি দেয় না। সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে সম্পদের হিসাব চেয়ে চিঠি দেয়া হয়। সরকারি দলের অনেকের এবং এমনকি খোদ দুদকের অনেক কর্মকর্তা, যাদের সন্দেহজনক সম্পদ রয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হবে কি-না জানতে চাইলে তিনি কিছুটা থমকে যান। একপর্যায়ে বলেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে সে যে-ই হোক দেখা যাবে।
গত সোমবার রাতে দুদক চেয়ারম্যানের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি আমার দেশ-এর বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন। এর আগে সোমবার বিকালে সেগুনবাগিচায় দুদক কার্যালয়ে তার সঙ্গে দেখা করার জন্য গেলে একান্ত সচিব মোখলেসুর রহমান জানান, স্যার অনেক ব্যস্ত। তখন অবশ্য এ প্রতিবেদকের উপস্থিতিতেই বিভিন্ন পেশার সাধারণ দর্শনার্থীকে দুদক চেয়ারম্যানের সঙ্গে সাক্ষাত্ করতে দেখা গেছে। প্রায় ঘণ্টাখানেক বসেও সাক্ষাতের অনুমতি না পেয়ে রাতে প্রথমে বাসার ল্যান্ডফোনে যোগাযোগ করা হয়। তখন বলা হয়, স্যার বাসায় নেই। একপর্যায়ে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হয়। তখন তিনি কথা বলেন।
এদিকে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ১৭টি কুইক রেন্টাল বিদ্যুেকন্দ্র স্থাপনের জন্য বিনাটেন্ডারে দলীয় লোকদের বরাদ্দ দেয়া হয়। এসব কুইক রেন্টাল বরাদ্দ পাওয়া কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি হয়েছে উচ্চমূল্যে বিদ্যুত্ কেনার। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে একটি কুইক রেন্টালও বিদ্যুত্ সরবরাহ করতে পারেনি। বিনাটেন্ডার ও সরকারের স্বেচ্ছাচারী মনোভাবে উচ্চমূল্যে বেসরকারি খাত থেকে বিদ্যুত্ কেনার চুক্তির কারণে বছরে রাষ্ট্রের ৩ হাজার ৫৯১ কোটি টাকা ক্ষতির অভিযোগও ইতোমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে।
বিনাটেন্ডারে কুইক রেন্টাল বিদ্যুেকন্দ্র ছাড়াও সরকারের অন্যান্য কাজের টেন্ডারেও রয়েছে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি। দলীয় লোকদের বিনাটেন্ডারে কাজ দিতে সরকার ক্রয়নীতিরও সংশোধন করেছে। এসব অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে প্রায় প্রতিদিনই দৈনিক পত্রিকাগুলোতে সংবাদ ছাপা হচ্ছে। অথচ দুদক চেয়ারম্যান বলছেন বিনাটেন্ডার বা টেন্ডারে অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়ে তাদের নজরে কিছু নেই। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গত ১৮ এপ্রিল টেন্ডার নিয়ে শৈলকূপায় আওয়ামী লীগের দু’গ্রুপের সংঘর্ষে একজন নিহত হয়েছে। গত মার্চ মাসে বরিশাল সিটি করপোরেশনে টেন্ডারের আগেই ১১২ কোটি টাকার কাজ বরাদ্দ দেয়া হয় ঠিকাদারকে। ২০১০ সালের মে মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৬ কোটি ৬২ লাখ টাকার নির্মাণকাজ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে বিনাটেন্ডারে। গত বছরের ৮ এপ্রিল টেন্ডার দখল নিয়ে পঞ্চগড়ে যুবলীগের হাতে ছাত্রলীগকর্মী খুন হয়েছে। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে শৈলকূপায় দরপত্র আহ্বানের আগেই রাস্তা পাকা করার কাজ শুরু হয়। এসব অনিয়ম-দুর্নীতির খবর সরকার সমর্থক বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকেও ফলাও করে প্রচারিত হয়েছে।
দেশে বর্তমানে সবচেয়ে আলোচিত টাকা পাচারের ঘটনা হচ্ছে শেয়ারবাজার। শেয়ারবাজার থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা উঠিয়ে পাচার করেছে সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রভাবশালী মহল। ইতোমধ্যে সরকারের গঠিত তদন্ত কমিটির রিপোর্টেও সরকারি দলের অনেকের নাম উঠে এসেছে।
দুর্নীতি দমন কমিশনে অনুসন্ধান চালিয়ে দেখা গেছে, তারা বিরোধী দলের সদস্য বা সরকারের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ব্যস্ত রয়েছেন। সরকারের দুর্নীতি ও অনিয়ম দেখার সময় এখন তাদের নেই। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুদকের এক কর্মকর্তা বলেন, আমরা এখন সরকার তোষণে ব্যস্ত আছি। কী করলে সরকার খুশি হবে, সেদিকেই কর্তাদের নজর। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সরকারি দলের নেতাদের দুর্নীতির মামলা হাইকোর্ট বিভাগে খারিজ হয়ে গেলে দুদক আপিল করে না। বিরোধী দলের কারও মামলা হাইকোর্ট বিভাগে খারিজ হলে সঙ্গে সঙ্গে আপিল করা হয়। এমনকি কারও জামিন হলে সেটা বাতিল করার জন্যও আপিল করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন সবাই।
ওই কর্মকর্তা বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দায়ের করা মিগ-২৯ যুদ্ধবিমান ক্রয়ে দুর্নীতি মামলা, ফ্রিগেট ক্রয়ে দুর্নীতি মামলা, নভোথিয়েটার নির্মাণে দুর্নীতি মামলাসহ ৯টি মামলা হাইকোর্ট বাতিল করার পর দুদক কোনোটির বিরুদ্ধে আপিল করেনি। একইভাবে সরকারি দলের নেতা গডফাদার হিসেবে খ্যাত নারায়ণগঞ্জের শামীম ওসমান, হাজী সেলিমসহ অনেকের দুর্নীতি মামলা সম্প্রতি হাইকোর্ট বিভাগ থেকে খারিজ হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধেও দুদক কোনো আপিল করেনি। অপরদিকে বিরোধীদলীয় নেতার দুই ছেলে তারেক রহমান ও আরাফাত রহমানসহ বিরোধী দলের নেতাদের বিরুদ্ধে সেনানিয়ন্ত্রিত জরুরি সরকারের দায়ের করা মামলা নিম্ন আদালতে দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগও রয়েছে দুদকের।
ক্ষমতা তোষণে ব্যস্ত থাকার পরও সরকার আইন সংশোধন করে দুদকের হাত-পা বেঁধে দিচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর দফতরের অনুমোদন ছাড়া দুদক সরকারি কর্মকর্তা ও সরকারের কারও বিরুদ্ধে মামলা করতে পারবে না—এই আইন পাসের অপেক্ষায় রয়েছে জাতীয় সংসদে। দুদকের বিদ্যমান আইনে সংশোধনী এনে জাতীয় সংসদে এই প্রস্তাব করেছে সরকার
।

বিদায়ী প্রধান বিচারপতিকে বারের গায়েবানা সংবর্ধনা : বিচার বিভাগকে যেন আল্লাহ রক্ষা করেন








স্টাফ রিপোর্টার
সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ এখন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগেরই অংশ বলে উল্লেখ করেছে সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতি। বিদায়ী প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকের অনুপস্থিতিতে আইনজীবী সমিতির দেয়া এক গায়েবানা সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন তাকে উদ্দেশ করে বলেন, প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর গত ৭ মাসে আপনি আওয়ামী লীগেরই প্রতিনিধিত্ব করেছেন। বিচার বিভাগকে ধ্বংস করেছেন। সেই সঙ্গে সংবিধানকে লণ্ডভণ্ড করে দেশকে গভীর সঙ্কটের মধ্যে ফেলে দিয়ে এখন বিদায় নিচ্ছেন। আমরা দোয়া করি, মহান আল্লাহ যেন আপনার করে যাওয়া সর্বনাশা কাজ থেকে বিচার বিভাগকে হেফাজত করেন। প্রধান বিচারপতি খায়রুল হককে ঠাণ্ডামাথার চালাক ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করে বার সভাপতি আরও বলেন, প্রধান বিচারপতি অতিমাত্রার একজন ভদ্র ও বিনয়ী ব্যক্তি। একই সঙ্গে তিনি চালাক-চতুরও। অত্যন্ত ঠাণ্ডামাথায় তিনি মানুষ খুনের মতো বিচার বিভাগকে খুন করে ফেলেছেন।
খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর দেশের একটি প্রতিষ্ঠানও দলীয়করণের বাইরে নেই। সর্বোচ্চ আদালত আপিল বিভাগকেও আওয়ামী লীগের অংশে পরিণত করা হয়েছে। বিচার বিভাগের অভিভাবক হিসেবে অধিষ্ঠিত হয়ে প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক পুরোটা সময় আওয়ামী লীগের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। হাইকোর্টের কোনো একটি ডিভিশন বেঞ্চ সরকারের বিপক্ষে রায় দেয়ার পরপরই তিনি ওই বেঞ্চের ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে সর্বোচ্চ আদালতে দলীয়করণের ন্যক্কারজনক অধ্যায় রচনা করেছেন। আওয়ামী লীগের নির্বাহী পরিষদে গৃহীত সিদ্ধান্তই আপিল বিভাগের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এ সুযোগে আদালতের ঘাড়ে বন্দুক রেখে সরকার দেশ চালায়। সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতি ভবনের দক্ষিণ হলে গতকাল দুপুরে বিদায়ী প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকের সৌজন্যে এই গায়েবানা সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
গায়েবানা সংবর্ধনা : বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক গত বছরের ১৯ সেপ্টেম্বর দেশের ১৯তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। প্রধান বিচারপতি হিসেবে ৭ মাস দায়িত্ব পালন শেষে গতকাল তিনি শেষ অফিস করেন। আজ তিনি অবসরে যাচ্ছেন। সুপ্রিমকোর্টের চিরাচরিত প্রথা অনুযায়ী সুপ্রিমকোর্ট বার সমিতির পক্ষ থেকে তাকে বিদায়ী সংবর্ধনা দেয়ার কথা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বারের পক্ষ থেকে তাকে বিদায়ী সংবর্ধনা দেয়া সম্ভব না হওয়ায় বিকল্প হিসেবে গায়েবানা সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়। গায়েবানা সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন সম্পর্কে আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদল সাংবাদিকদের বলেন, আইনজীবী সমিতির পক্ষ থেকে বিদায়ী প্রধান বিচারপতিকে সংবর্ধনা দেয়ার সব আয়োজন শেষ করা হয়েছে। হঠাত্ রোববার প্রধান বিচারপতির পক্ষ থেকে আমাদের টেলিফোনে জানানো হয়েছে, অনিবার্য কারণে প্রধান বিচারপতি আইনজীবী সমিতির দেয়া সংবর্ধনা গ্রহণ করবেন না। তিনি সংবর্ধনা গ্রহণ করতে অপারগতা জানিয়েছেন। এ কারণেই আমরা তার গায়েবানা সংবর্ধনার আয়োজন করেছি। গায়েবানা সংবর্ধনার আয়োজন সম্পর্কিত সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মুসলমানদের ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী মৃত্যুর পর কারও লাশ পাওয়া না গেলে তার গায়েবানা জানাজা পড়া হয়। আমরা যেহেতু সংবর্ধনা দেয়ার জন্য প্রধান বিচারপতির সামনে উপস্থিত হতে পারিনি, তাই তার অনুপস্থিতিতেই গায়েবানা সংবর্ধনার আয়োজন করলাম। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে আইনজীবী সমিতির নির্বাচিত কর্মকর্তারা ছাড়াও সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক, অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন, অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরী, অ্যাডভোকেট আফজাল এইচ খান, অ্যাডভোকেট ফাহিমা নাসরিন মুন্নি, অ্যাডভোকেট সৈয়দা আসিফা আশরাফি পাপিয়া, ব্যারিস্টার ফখরুল ইসলাম, অ্যাডভোকেট গোলাম মোহাম্মদ চৌধুরী আলাল, অ্যাডভোকেট ফেরদৌস আক্তার ওয়াহিদা, অ্যাডভোকেট গাজী কামরুল ইসলাম সজল, ব্যারিস্টার নাসিরউদ্দিন অসীম, ব্যারিস্টার পারভেজ আহমেদসহ কয়েকশ’ আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন।
সংবর্ধনায় দেয়া বক্তব্য : প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হককে বিদায়ী সংবর্ধনা জানিয়ে সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির পক্ষ থেকে দেয়া লিখিত বাণীতে উল্লেখ করা হয়েছে, আপনি দেশের ১৯তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিযুক্ত হওয়ার পর সুপ্রিমকোর্টের অবকাঠামোগত উন্নয়নে অসাধারণ ভূমিকা রেখেছেন। আর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে আপনি আপনার দায়িত্ব থেকে অবসর নিতে যাচ্ছেন। আইনজীবী সমিতি আপনার মধ্যে বিনয় ও সৌজন্যতাবোধ দেখে এসেছে। হাইকোর্টের প্রতিটি বেঞ্চে আপনি ল’ রিপোর্ট ও দুটি করে কম্পিউটারসহ অন্যান্য সরঞ্জাম দিয়েছেন। কিন্তু আইনজীবী সমিতি হলরুমের এসিগুলোতে বিদ্যুত্ সংযোগ ও এটিএম বুথ স্থাপনে আপনার দফতর থেকে বাধা দেয়া হয়েছে। সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি স্বাক্ষরিত ওই বাণীতে আরও বলা হয়েছে, আমাদের বিচার বিভাগের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ও উজ্জ্বল ইতিহাস রয়েছে। অতীতের সব ঐতিহ্য ক্ষুণ্ন করে আপনার সময়েই আমরা আদালতে রায়ট পুলিশ, দাঙ্গা পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমাগম ঘটতে দেখেছি। অতীতে যা কখনোই দেখা যায়নি। বাদপড়া বিতর্কিত দু’জন বিচারপতিকে আপনার আগের প্রধান বিচারপতি ফজলুল করিমও শপথ দেননি। অথচ আপনি দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই তাদের শপথ দিয়ে বিচার বিভাগের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করেছেন।
মুন সিনেমা হল সংক্রান্ত মামলার রায় সম্পর্কে গায়েবানা সংবর্ধনায় প্রধান বিচারপতিকে উদ্দেশ করে লিখিত বাণীতে বলা হয়েছে, মুন সিনেমা হলের মামলায় আপনি সংবিধানের গোটা পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করে বিতর্কিত রায় দিয়েছেন। আপনি মূল সংবিধানের বিলুপ্ত কিছু অনুচ্ছেদ পুনরুজ্জীবিত করার কথা বলেছেন। আবার কিছু বিষয়ে সংসদকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে, যার সমাধান এখনও হয়নি। আপনার রায়ে সংবিধান লণ্ডভণ্ড হয়েছে। অথচ যে ব্যক্তি সিনেমা হলের মালিকানা দাবি করে মামলা করলেন, তিনি এখনও কিছুই পেলেন না। আপনার এ বিতর্কিত রায়ের পর দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। আপনার এ রায় দেশের বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে হুমকির মধ্যে ফেলেছে। আপনার রায়ের ওপর ভিত্তি করেই ক্ষমতাসীন সরকার মূল সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদ আবার বহাল করতে যাচ্ছে তাদের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে। এতে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা মারাত্মকভাবে হুমকির মধ্যে পড়বে।
নয় পৃষ্ঠার এ সংবর্ধনা বাণীতে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী সংক্রান্ত আপিলের রায় সম্পর্কে বলা হয়েছে, ত্রয়োদশ সংশোধনীর বিষয়ে আপনি সংক্ষিপ্ত আদেশ দিয়েছেন। এর পূর্ণাঙ্গ আদেশের অপেক্ষায় আমরা থাকলাম। কিন্তু আপনার সংক্ষিপ্ত আদেশেই স্ববিরোধিতা ও সংশয় রয়েছে। আপনি একদিকে বলেছেন তত্ত্বাবধায়ক সরকার সংক্রান্ত ওই সংশোধনী বাতিল। একই সঙ্গে আবার বলেছেন পরবর্তী দুটি জাতীয় নির্বাচন এই সরকারের অধীনে হতে পারে। যদি এটাই হয়, তাহলে আপনিই হবেন পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা। এ কারণেই আমরা আপনাকে আগামী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার পদ গ্রহণ না করার জন্য অনুরোধ জানিয়ে রাখছি। গ্রামীণ ব্যাংকের এমডি নোবেলবিজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মামলার রায় সম্পর্কে বারের এ গায়েবানা সংবর্ধনায় বলা হয়েছে, বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের জন্য বিরল সম্মান বয়ে আনা নোবেলবিজয়ী ড. ইউনূসের মামলার বিষয়ে হাইকোর্ট ন্যায়বিচার করেননি। সামান্যতম ন্যায়বিচারের দরজা খোলা থাকলেও হাইকোর্টের উচিত ছিল ওই মামলায় রুল জারি করা। কিন্তু হাইকোর্ট মামলার বাদীকে ওই ধরনের কোনো সুযোগ না দিয়ে রিটটি সরাসরি খারিজ করে দিয়েছেন। ড. ইউনূসের আইনজীবীরা হাইকোর্টের বিরুদ্ধে অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ এনেছেন। ড. কামাল হোসেন এ বিষয়টি জংলি শাসনের সঙ্গে তুলনা করেছেন। হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেও তিনি ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। ড. ইউনূসের মামলায় আমাদের বিচার বিভাগের দ্বৈন্যদশার চিত্র ফুটে উঠেছে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার বাড়ি সংক্রান্ত মামলার রায়ের প্রসঙ্গ তুলে ধরে অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন তার লিখিত বক্তব্যে প্রধান বিচারপতিকে উদ্দেশ করে বলেন, বেগম খালেদা জিয়া হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছেন। আপিল বিভাগ এ আপিল গ্রহণও করেছেন। কিন্তু এ আপিল নিষ্পত্তির আগেই খালেদা জিয়াকে তার বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করেছে সরকার। উচ্ছেদের দিন আমরা সিনিয়র আইনজীবীরা ব্যারিস্টার রফিক-উল হককে নিয়ে আপনার সঙ্গে দেখা করেছি। আপনি আমাদের আশ্বস্ত করলেন, মামলা নিষ্পত্তি হওয়ার আগে বাদীকে তার বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হবে না। কিন্তু আপনার এ আশ্বাসের পরও তাকে তার চল্লিশ বছরের স্মৃতিবিজড়িত বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হলো কীভাবে? আজ এটাই আমাদের প্রশ্ন। মামলা নিষ্পত্তির আগে এ ধরনের ঘটনা বাংলাদেশের বিচারের ইতিহাসে একটিই ঘটেছে। আর সেটা ঘটল আপনার সময়েই। হাইকোর্টের বেঞ্চ পুনর্গঠনের বিষয়ে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বলা হয়েছে, হাইকোর্টকে সরকারের পক্ষে রায় দিতে বাধ্য করা হয়েছে আপনার সময়ে। যে দু’একটি ডিভিশন বেঞ্চ সরকারের বিপক্ষে সত্যের পক্ষে রায় দিয়েছেন, তাত্ক্ষণিকভাবে আপনি তাদের বিচারিক এখতিয়ার কেড়ে নিয়েছেন। এ ধরনের ন্যক্কারজনক ঘটনা বিচার-ইতিহাসে আর হয়নি। আপনি সিনিয়র ও দক্ষ বিচারপতিদের বসিয়ে রেখে অপেক্ষাকৃত জুনিয়র এবং স্থায়ীভাবে নিয়োগ পাননি—এমন বিচারপতিদের দিয়ে আপনি ডিভিশন বেঞ্চ গঠন করে একটি নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছেন। আপনি মামলা নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে রেকর্ড সৃষ্টির কথা বলছেন। অথচ আপনি পুরনো মামলাগুলো রেখে দিয়ে ২০০৯ ও ২০১০ সালে বর্তমান সরকারের সময়ে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের নামে দায়ের করা মিথ্যা ও রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলাগুলো নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করেছেন। অথচ ২০০১ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত সময়ে দায়ের করা মামলাগুলো আপনি নিষ্পত্তির তালিকায় আনেননি। এতেই আপনার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়।
অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, প্রধান বিচারপতি অবশ্য শেষদিকে এসে তার হাত-পা বাঁধার কথা স্বীকার করেছেন। তিনি শেষ মুহূর্তে এসে বলেছেন, তাদের হাত-পা বেঁধে সাঁতার কাটতে দেয়া হয়েছে।
বিচার বিভাগকে দলীয়করণের নজির উপস্থাপন করে বার সভাপতি আরও বলেন, ৫০ জন বিচারপতিকে ডিঙিয়ে হাইকোর্ট থেকে বিচারপতি নিয়ে আপিল বিভাগে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এ ঘটনা নজিরবিহীন। এক প্রশ্নের জবাবে খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক আওয়ামী লীগের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। তার সময়েই আপিল বিভাগকে আওয়ামী লীগ সরকারের অংশে পরিণত করা হয়েছে। তিনি বলেন, সংবিধান লণ্ডভণ্ড করলে বিচারপতি খায়রুল হক কিন্তু বহুদলীয় গণতন্ত্র ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা হত্যাকারী সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর বিষয়ে একটি শব্দও উচ্চারণ করেননি। তার মতলবটা এখানেই পরিষ্কার।
নবনিযুক্ত প্রধান বিচারপতিকে উদ্দেশ করে বার সভাপতি বলেন, বিচারপতি খায়রুল হক নিজের নাম জাহির করতে সাধারণ মানুষের মামলাগুলো নিষ্পত্তির জন্য লিস্টে না দিয়ে রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক ইস্যুতে দায়ের করা মামলাগুলো নিষ্পত্তি করেছেন। প্রতিদিনই সংবাদপত্রে তার নাম বড় করে ছাপা হয়েছে। আপনি এটা করবেন না। বিচারপ্রার্থীরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হলে শেষ পর্যন্ত তারা আইন নিজের হাতে তুলে নেবেন। এটা দেশের জন্য কোনো অবস্থায়ই কল্যাণকর হবে না। দেশকে অনিশ্চিত অবস্থার দিকে ঠেলে দেবেন না
।

দেশে জংলি শাসন চলছে : ড. কামাল

স্টাফ রিপোর্টার

‘দেশে বর্তমানে জংলি শাসন চলছে। সম্পূর্ণ জংলি কায়দায় বিচার বিভাগকে চালানো হচ্ছে। আইয়ুব, ইয়াহিয়া, এরশাদের সেনা শাসনেও আদালতে আবেদন-নিবেদন করার সুযোগ পেয়েছি। বর্তমানে তাও পাচ্ছি না’। প্রবীণ আইনজীবী ড. কামাল হোসেনের এ বক্তব্যের জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেছেন, দেশের বিচার ব্যবস্থায় বর্তমানে সোনালী যুগ চলছে। বর্তমান আদালত বঙ্গবন্ধু হত্যা, জেল হত্যা মামলা, সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী ও সপ্তম সংশোধনী মামলা, খালেদা জিয়ার বাড়ি মামলাসহ পরিবেশ সংরক্ষণসহ বিভিন্ন বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। কাজেই ড. কামাল হোসেন যে মন্তব্য করেছেন তা আদৌ সঠিক নয়। ড. কামাল হোসেন একজন হতাশাগ্রস্ত ব্যক্তি। হতাশা থেকেই তিনি এসব মন্তব্য করেছেন। সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগে ড. ইউনূসের আবেদনের শুনানি শেষে অ্যাটর্নি জেনারেল গতকাল তার কার্যালয়ে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন।
প্রসঙ্গত, আপিল বিভাগে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের আবেদনের ওপর শুনানিতে ড. কামাল হোসেন বাধাপ্রাপ্ত হয়ে আদালত থেকে বেরিয়ে সাংবাদিকদের কাছে বিচার ব্যবস্থা সম্পর্কে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, আমার দীর্ঘ ওকালতি জীবনে উচ্চ আদালতের এ চরম দুরবস্থা আর দেখিনি। ওয়ান-ইলেভেনের সেনাশাসিত সরকারের সময়ও আমরা আদালতে কথা বলার সুযোগ পেয়েছি। আমরা কথা বলতে চাইলে আদালত আমাদের কথা শুনেছেন। ব্রিটিশ কলোনিয়াল শাসনের সময় বিচার বিভাগের অবস্থা সম্পর্কে পড়েছি। পাকিস্তান আমলে জেনারেল আইয়ুব ও ইয়াহিয়ার সময়েও আমরা আদালতে কথা বলেছি। বাংলাদেশে স্বৈরাচারের শাসনামলেও আইনজীবীরা আদালতে সুবিচারের প্রার্থনা নিয়ে এসেছেন। আদালত আমাদের কথা শুনেছেন। কিন্তু বর্তমানে আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে উচ্চ আদালতের অবস্থা বহুগুণ খারাপ। ড. কামাল হোসেনের এ বক্তব্যের জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল আরও বলেন, আদালত যে সময়ে বহু দিকনির্দেশনামূলক রায় দিচ্ছেন, ঠিক তখনই ড. কামাল হোসেন আদালত নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করেছেন। এটা বড়ই দুঃখজনক।
শুনানি অব্যাহত : ড. ইউনূসের লিভ টু আপিল খারিজাদেশ প্রত্যাহার করে আরও শুনানির প্রার্থনা জানিয়ে করা আবেদনের ওপর শুনানি অব্যাহত রয়েছে। প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকের সভাপতিত্বে আপিল বিভাগের সাত সদস্যের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ গতকাল দ্বিতীয় দিনের মতো শুনানি গ্রহণ করেন। একই সঙ্গে গ্রামীণ ব্যাংকের পরিচালনা পরিষদের ৯ সদস্যের পক্ষে করা লিভ টু আপিলেরও শুনানি চলছে। গতকাল ড. ইউনূসের পক্ষে শুনানি করেন ড. কামাল হোসেন ও ব্যারিস্টার রোকনউদ্দিন মাহমুদ। শুনানিতে তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক ড. ইউনূসকে অপসারণের কোনো ক্ষমতা রাখে না। গ্রামীণ ব্যাংক আর সরকারের অন্যান্য ব্যাংক এক নয়। গ্রামীণ ব্যাংক পরিচালিত হয় এর নিজস্ব আইন দ্বারা। ওই আইনের ক্ষমতাবলে ব্যাংকটির পরিচালনা পরিষদ ড. ইউনূসকে এমডি পদে নিয়োগ দিয়েছে। এটি বাংলাদেশ ব্যাংক জানত। গ্রামীণ ব্যাংকের নয়জন পরিচালকের পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার সারা হোসেন। এ সময় ড. ইউনূসের অপর আইনজীবী সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল মাহমুদুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন। সরকারপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট তৌফিক নেওয়াজ। ড. কামাল হোসেনের আগের দিনের বক্তব্যের সূত্র ধরে ব্যারিস্টর রোকনউদ্দিন মাহমুদ বলেন, ড. ইউনূসকে অব্যাহতি দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক এখতিয়ারবহির্ভূত কাজ করেছে। গ্রামীণ ব্যাংক তাদের পরিচালনা পরিষদের সভায় এমডির ক্ষেত্রে নিয়োগের সময়সীমা বেঁধে দেয়নি। যতদিন পর্যন্ত পরিচালনা পরিষদের সিদ্ধান্ত না নেবে, ততদিন পর্যন্ত তিনি এ পদে থাকতে পারবেন। তাছাড়া তার দায়িত্ব পালনের বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংক অবহিত ছিল। প্রতি বছরই তারা গ্রামীণ ব্যাংকের কার্যক্রম নিরীক্ষা করেছে। জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, আপিল বিভাগ যে আদেশ দিয়েছেন তা প্রত্যাহারের কোনো সুযোগ নেই। এ ধরনের সুযোগ একবার দেয়া হলে বিচার ব্যবস্থায় চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে। তিনি বলেন, পদবির ভিন্নতা থাকলেও আইন সবার জন্য সমান। এমডির জন্য পৃথক আইন হতে পারে না।