Saturday, 18 August 2012
হবিগঞ্জে স্কুলছাত্রের ১০টুকরা লাশ উদ্ধার
Sat 18 Aug 2012 9:17 PM BdST
হবিগঞ্জ, ১৮ আগস্ট (রিয়েল-টাইম নিউজ ডটকম)-- হবিগঞ্জের মাধবপুর এক স্কুল শিক্ষার্থীর ১০ টুকরা লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। নিহতের পরিবারের দাবি, তাকে হত্যা করে লাশ ফেলে রাখা হয়েছে।
শনিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে মাধবপুরের রাজাপুর থেকে লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
নিহত ওই স্কুল শিক্ষার্থী উপজেলার রাজাপুর গ্রামের সেলিম মিয়ার ছেলে শাহজাহান মিয়া (১৫)। সে স্থানীয় একটি স্কুলের দশম শ্রেনীর শিক্ষার্থী।
স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, শনিবার সকাল সাড়ে ১০টায় উপজেলার মনতলা রেলস্টেশনের কাছে রাজাপুর নামকস্থানে স্থানীয় লোকজন শাহজাহানের টুকরো টুকরো লাশ দেখতে পেয়ে পুলিশকে খবর দেয়। খবর পেয়ে জিআরপি পুলিশ দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে লাশ উদ্ধার করে।
শাহজাহানের পরিবার ও এলাকার লোকজন জানান, নিহতের গায়ে কাদা ও আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। তাদের ধারণা, শাহজাহানকে হত্যা করে ট্রেনের নিচে ফেলা রাখা হয়েছে।
রিয়েল-টাইম নিউজ ডটকম/প্রতিনিধি/একেএ/মাম_২১১৬ ঘ.
http://www.real-timenews.com/details.php?id=50854&p=1&s=4
নতুন জামা না দিতে পেরে দুই সন্তানকে পদ্মায় ফেলে দিলেন বাবা
Sat 18 Aug 2012 5:51 PM BdST
কুষ্টিয়া, ১৮ আগস্ট (রিয়েল-টাইম নিউজ ডটকম)-- ঈদের নতুন পোষাক কিনে দিতে না পেরে কুষ্টিয়ার লালন শাহ সেতুর উপর থেকে দুই সন্তানকে পদ্মায় ফেলে দিয়ে হত্যা করেছে এক পাষণ্ড বাবা।
শনিবার দুপুরে নির্মম এ ঘটনাটি ঘটিয়েছেন কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলার বারদাগ গ্রামের বাসিন্দা আবদুল মালেক।
এলাকাবাসী জানিয়েছে, আব্দুল মালেকের দুই সন্তান মুন্নি (১০) ও মানসুর (৫) ঈদের জন্য বাবার কাছে নতুন জামা কাপড় চায়। নতুন জামার জন্য সন্তানেরা জেদ করলে বাবা তার দুই সন্তানকে ঈদের জামা কাপড় কিনে দেওয়ার জন্য সকালে বাড়ি থেকে বের হয়।
কিন্তু আব্দুল মালেক দুই সন্তানকে বাজারের দিকে না দিয়ে লালন শাহ ব্রিজের দিকে নিয়ে যেতে থাকে।
বাজারে না গিয়ে ব্রিজের ওপর কেন যাচ্ছো সন্তানদের এমন প্রশ্নের কোনো জবাব না দিয়ে মালেক প্রথমে মুন্নীকে সেতুর ওপর থেকে ধাক্কা দিয়ে নদীতে ফেলে দেয়।
এ ঘটনা দেখে শিশুপুত্র মানসুর জীবন বাঁচানোর তাগিদে চিৎকার করতে করতে দৌঁড়াতে থাকে। কিন্তু বাঁচতে পারেনি পাষণ্ড পিতার হাত থেকে। কিছুদূর যাওয়ার পরই মানসুরকে ধরে ফেলে মালেক। পরে তাকেও হাত পা ধরে বোনের মতই পদ্মা নদীতে ফেলে দিয়ে নিজেও লাফ দেয়।
এলাকাবাসী মালেককে উদ্ধার করতে পারলেও তার দুই সন্তানকে নদী থেকে উদ্ধার করতে পারেনি। মালেককে অসুস্থ অবস্থায় উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পুলিশ পাহারায় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মালেক জানান ‘অভাবের সংসার, পেটে ভাত নাই, সন্তান বাঁচি রাখি কী করব? তাই ব্রিজের ওপর নিয়ে ওদেরকে ফেলি দিছি।’
নিহত সন্তানদের মা মমতাজ খাতুন বলেন, শনিবার সকাল ৯টার দিকে দুই ছেলেমেয়েকে জামা কাপড় কেনা ও চুল কাটানোর কথা বলে নিয়ে যায় মালেক। এরপর তাদের কেউ আর ফিরে আসেনি। পরে তিনি শুনতে পান, ছেলে-মেয়েকে তার স্বামী নদীতে ফেলে দিয়েছেন।
ভেড়ামারা থানার সহকারি উপপরিদর্শক (এএসআই) আবদুল মতিন বলেন, মালেককে পুলিশ পাহারায় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। দুই সন্তানকে পদ্মা নদীতে ফেলে দেওয়ার কথা সুস্থ অবস্থায় তিনি স্বীকার করেছেন। এ ব্যাপারে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে দুই সন্তানকে উদ্ধারে এলাকাবাসী ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা নদীতে নেমেছেন। উদ্ধার তৎপরতা চলছে।
রিয়েল-টাইম নিউজ ডটকম/প্রতিনিধি/একেএ/মাম_১৭৪৯ ঘ.
http://www.real-timenews.com/details.php?id=50850&p=1&s=4
Thursday, 9 August 2012
নিজগ্রামে সোহেলের দাফনসম্পন্ন : বিক্ষোভে উত্তাল রাবি ক্যাম্পাস : ভিসির অপসারণ দাবি, ছাত্রলীগের ১৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা, আটক ১
রাবি ও কাউনিয়া (রংপুর) প্রতিনিধি
ছাত্রলীগের দু’গ্রুপের সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত ছাত্রলীগ নেতা আবদুল্লাহ আল হাসান সোহেলের দাফনসম্পন্ন হয়েছে। রংপুরের কাউনিয়া উপজেলায় নিজগ্রামে জানাজা শেষে পারিবারিক গোরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
এদিকে সোহেল হত্যার ঘটনায় গতকাল শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন মহলের বিক্ষোভে উত্তাল ছিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। সকাল থেকেই বিভিন্ন সংগঠনের বিক্ষোভ ও মৌন মিছিল, মানববন্ধন, মুখে কালো কাপড় ও কালোব্যাজ ধারণ, সংবাদ সম্মেলন, নিন্দা ও বিবৃতিসহ এসব কর্মসূচি থেকে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবিসহ সরকারদলীয় ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ডের তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়। শিক্ষক শিক্ষার্থীরা এ সময় বর্তমান ভিসির আমলে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ৪ ছাত্রের নিহত হওয়ার কথা উল্লেখ করে তার অপসারণ দাবি করেন তারা। এদিকে এ ঘটনায় ছাত্রলীগের ১৪ জনকে আসামি করে মামলা হয়েছে। আসামিদের একজনকে আটক করেছে পুলিশ।
সোহেলের দাফনসম্পন্ন : রংপুরের কাউনিয়া উপজেলায় নিজ গ্রামে সাবদী মাদরাসা মাঠে গতকাল সোহেলের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। তার বাবা মৌলভী আবদুস সালাম জানাজায় ইমামতি করেন। জানাজা শেষে পারিবারিক গোরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। তার আগে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ছেলেকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করেছিলাম। আশা ছিল সোহেল মানুষের মতো মানুষ হয়ে বাড়ি ফিরবে, কিন্তু আজ আমার ছেলে লাশ হয়ে ফিরল। তিনি সরকারের প্রতি আকুল আবেদন জানিয়ে বলেন, আমিই যেন এই দেশের শেষ বাবা হই যার ছেলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে লাশ হয়ে ঘরে ফিরল।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে সোমবার বিকালে ঢাকা থেকে সোহেলের লাশ রাত সাড়ে ১১টায় তার গ্রামের বাড়িতে পৌঁছায়। তখন আশপাশের গ্রামের নারী, পুরুষ, শিশু-কিশোরের ঢল নামে তাদের প্রিয় সোহেলকে এক নজর দেখতে।
১৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা, আটক ১ : এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও সভাপতি গ্রুপের সমর্থক তৌহিদ আল তুহিনকে প্রধান আসামি করে ১৪ জন ছাত্রলীগ নেতাকর্মীর নাম উল্লেখ এবং অজ্ঞাত আরও ২-৩ জনের বিরুদ্ধে মতিহার থানায় একটি হত্যামামলা হয়েছে। সোমবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে অপর সাংগঠনিক সম্পাদক মো. নোমান বাদী হয়ে এ মামলা করেন। মামলার অন্যতম আসামি ও ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি আশরাফুজ্জামান সোহেলকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গতকাল দুপুরে একই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ছাত্রলীগের সংবাদ সম্মেলন চলার সময় ক্যাফেটেরিয়ার সামনে থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। মামলার অন্য আসামিরা পলাতক রয়েছে।
মতিহার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আনিছুর রহমান আমার দেশ-কে বলেন, সোহেল হত্যার ঘটনায় ছাত্রলীগের তুহিনসহ ১৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। মামলার তদন্তের স্বার্থে অনেক কিছুই এখন বলা সম্ভব হচ্ছে না। এরই মধ্যে একজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অন্যদের গ্রেফতারের প্রক্রিয়া চলছে বলে তিনি জানান।
শিক্ষকদের মৌন মিছিল : সোহেল হত্যার বিচার, হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ ও দুর্নীতিবাজ ভিসির অপসারণ দাবিতে ক্যাম্পাসে মৌনমিছিল করে জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরাম। বেলা ১১টায় মিছিলটি বিশ্ববিদ্যালয় সিনেট ভবনের সামনে থেকে শুরু হয়ে ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ শেষে প্রশাসন ভবনের সামনে শেষ হয়।
জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের সাধারণ সম্পাদক প্রফেসর ড. মো. ফজলুল হকের পরিচালনায় সমাবেশে বক্তব্য রাখেন, ফোরামের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ড. মো. শামসুল আলম সরকার। তিনি বলেন, বর্তমান ভিসি প্রতিনিয়ত ৭৩’র আইনের পরিপন্থী কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। সিন্ডিকেটে বেশ কয়েকজন ভিন্নমতালম্বী সদস্য থাকার পরও সোহেল হত্যা তদন্তের জন্য সিন্ডিকেটে দলীয় লোকদের সমন্বয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন। এর আগেও এরকম অনেক তদন্ত কমিটি হয়েছে কিন্তু কোনো প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখেনি। এ কমিটি থেকে নিরপেক্ষ তদন্ত আশা করা যায় না উল্লেখ করে প্রফেসর শামসুল বলেন, এ তদন্ত কমিটি ভেঙে দিয়ে সব মতের শিক্ষকদের সমন্বয়ে কমিটি চাই। তিনি বলেন, বর্তমান প্রশাসনের সময়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪ জন ছাত্র নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে। কিন্তু কোনোটির বিচার হয়নি। ভিসির মদতেই সোহেলকে হত্যা করা হয়েছে, কারণ তিনিই পদ্মা সেতুর চাঁদা তোলার দায়িত্ব ছাত্রলীগকে দিয়েছেন এবং কার্যক্রমের উদ্বোধনও করেছেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা দিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ। প্রফেসর শামসুল বর্তমান ভিসির পদত্যাগ দাবি করে বলেন, আমরা এ ভিসিকে আর চাই না। অবিলম্বে তার অপসারণ চাই।
সমাবেশে শিক্ষকরা নিহত সোহেলের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করেন। একই দাবিতে আজ শিক্ষকরা সকাল ১০টা থেকে ১১টা পর্যন্ত কর্মবিরতি ও কালোব্যাজ ধারণ কর্মসূচি পালন করবেন। দাবি পূরণ না হলে পরে কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করবেন বলেও জানান শিক্ষকরা। এসময় ইবির সাবেক ভিসি প্রফেসর মু. রফিকুল ইসলাম, সাদা দলের আহ্বায়ক মু. আজাহার আলী, বিজনেস স্টাডিজ অনুষদের ডিন ড. মো. আমজাদ হোসেনসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের শতাধিক শিক্ষক উপস্থিত ছিলেন।
৩০১ শিক্ষকের বিবৃতি : একইদিন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩০১ জন শিক্ষক এক বিবৃতিতে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ক্ষোভ ও নিন্দা জানিয়ে বলেন, বর্তমান প্রশাসনের সর্বোচ্চ কর্তাব্যক্তির অর্বাচীন ও দলবাজির নির্মম পরিণতি এ হত্যাকাণ্ড। পদ্মা সেতুর অর্থায়নের জন্য উঠানো চাঁদার ভাগিভাগি নিয়ে এই অনাকাঙ্ক্ষিত হত্যাকাণ্ডের সম্পূর্ণ দায়দায়িত্ব ভিসির ওপর বর্তায়। কারণ, তিনি নিজ উদ্যোগে সরকারদলীয় ছাত্র সংগঠনের মাধ্যমে বিতর্কিত চাঁদা তোলা কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। নিহত ছাত্রের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে শিক্ষকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা রক্ষায় অবিলম্বে এই দলবাজ ভিসির অপসারণ ও খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
বিবৃতিদাতা শিক্ষকদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যরা হলেন : প্রফেসর মু. আজহার আলী, এম রফিকুল ইসলাম, এম আমিনুল ইসলাম, ড. মামনুনুল কেরামত, ড. আবদুর রহমান সিদ্দিকী, সিএম মোস্তফা, ড. বেলাল হোসেন, এম আবুল হাশেম, এম নজরুল ইসলাম, এবিএম শাহজাহান, ড. শামসুল আলম সরকার, ড. আমজাদ হোসেন, ড. এম ফজলুল হক, এফ নজরুল ইসলাম প্রমুখ।
সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের শোভাযাত্রা ও মানববন্ধন : সোহেলের সহপাঠী সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীরা গতকাল মুখে কালো কাপড় বেঁধে ক্যাম্পাসে শোভাযাত্রা, মানববন্ধন ও সমাবেশ করেছে। সকাল সাড়ে ১০টায় বিভাগের সামনে থেকে শোভাযাত্রাটি শুরু হয়ে প্রশাসন ভবনের সামনে এসে ৫ মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। পরে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে এসে মানববন্ধন ও সংক্ষিপ্ত সমাবেশ করে শিক্ষার্থীরা। এসময় বক্তব্য রাখেন মাস্টার্সের শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল মামুন, অভিজিত রায়, ৪র্থ বর্ষের ইতি, ৩য় বর্ষের শীলা, বিপ্লব, আরিফ প্রমুখ। বক্তব্যের সময় অনেকেই সহপাঠীকে হারিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।
প্রগতিশীল ছাত্রজোটের বিক্ষোভ : একই ঘটনার প্রতিবাদে বেলা সাড়ে ১১টায় ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে প্রগতিশীল ছাত্রজোট। ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক এসএম ইফতেখারুল আলম শিপলুর পরিচালনায় সমাবেশে বক্তব্য রাখেন ছাত্র ইউনিয়ন সভাপতি শিপন আহমেদ। তিনি বলেন, বর্তমান প্রশাসন নিরাপত্তার নামে ক্যাম্পাসকে ক্যান্টনমেন্টে পরিণত করেছে। এখানে একের পর এক ছাত্র হত্যার ঘটনা ঘটছে। যেখানে সোহেল নিহত হয়েছে, সেখানে পুলিশের দুটি ক্যাম্প থাকার পরও পুলিশ কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি। তিনি অবিলম্বে ছাত্রলীগের নৈরাজ্য ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার, লোক দেখানো তদন্ত কমিটি বাতিল ও অবহেলার কারণে প্রশাসনের পদত্যাগ দাবি করেন।
ছাত্রলীগের সংবাদ সম্মেলনে পদ্মা সেতুর টাকা ভাগের বিষয় অস্বীকার : এদিকে পদ্মা সেতু নির্মাণে আদায় করা চাঁদার টাকার ভাগবাটোয়ারা নিয়ে ছাত্রলীগ নেতা সোহেল নিহতের বিষয়টি সংবাদমাধ্যমগুলোতে প্রচারের পর গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে তা অস্বীকার করেছে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ। দুপুর ২টায় এক সংবাদ সম্মেলনে ছাত্রলীগ সভাপতি আহম্মেদ আলী ও সাধারণ সম্পাদক আবু হুসাইন বিপু বলেন, তুচ্ছ ঘটনায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করেই রোববার রাতের ঘটনায় সোহেল নিহত হয়েছে। এ ঘটনার সঙ্গে কোনোভাবেই পদ্মা সেতুর চাঁদার টাকা ভাগবাটোয়ারার কোনো সম্পর্ক নেই। এর আগে বিভিন্ন প্রিন্ট এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় ছাত্রলীগের একাধিক নেতাকর্মী পদ্মা সেতুর টাকা ভাগবাটোয়ারা নিয়েই সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করেন। এদের মধ্যে আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক মেহেদী হাসান বারী অন্যতম। তবে তিনি গতকাল তার দেয়া আগের বক্তব্য অস্বীকার করেন।
ছাত্রলীগের দুজনকে বহিষ্কার : এ ঘটনায় রাবি শাখা ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটি তাদের দুই নেতাকে দল থেকে স্থায়ী বহিষ্কার করেছে। সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সভাপতি বদিউজ্জামান সোহাগ ও সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকী নাজমুল আলম স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়—ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদের সিদ্ধান্ত মোতাবেক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি আখেরুজ্জামান তাকিম এবং সাংগঠনিক সম্পাদক তৌহিদ আল তুহিনকে সংগঠনের শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও সংগঠনবিরোধী কর্মকাণ্ডের জন্য সংগঠন থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হলো।
তদন্ত কমিটির কাজ শুরু : এদিকে সিন্ডিকেট কর্তৃক গঠিত তদন্ত কমিটি তাদের তদন্ত কার্যক্রম শুরু করেছে বলে জানান কমিটির আহ্বায়ক প্রফেসর ড. গোলাম কবির। তিনি আমার দেশকে বলেন, আজ (গতকাল) কমিটির সব সদস্যের কাছে চিঠি পৌঁছানোর পর আমাদের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তবে তদন্ত কমিটি একপক্ষীয় এবং আগের কোনো তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ ও সুষ্ঠু বিচার না হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রশাসন গঠন করে দিয়েছে; এতে আমাদের করার কিছু নেই। এর আগে প্রতিবেদন জমা ও শাস্তির সুপারিশ করা হয়েছে। কিন্তু প্রশাসন সে ব্যাপারে পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। এরই মধ্যে গঠিত তদন্ত কমিটিকে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা একপক্ষীয় ও দলীয় উল্লেখ করে তা প্রত্যাখ্যান করেছেন।
উল্লেখ্য, গত রোববার রাতে ছাত্রলীগ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক গ্রুপের নেতাকর্মীদের মাঝে ব্যাপক সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ৩য় বর্ষের ছাত্র ও ছাত্রলীগ নেতা আবদুল্লাহ আল হাসান সোহেল। ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা অভিযোগ করেন, পদ্মা সেতু নির্মাণে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায় করা চাঁদার টাকার ভাগবাটোয়ারা নিয়ে সোহেলকে হত্যা করা হয়।
এদিকে সোহেল হত্যা মামলায় গ্রেফতারকৃত এজাহারভুক্ত আসামি ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি আশরাফুজ্জামান সোহেলকে ২ দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। মতিহার থানার ওসি আনিছুর রহমান বলেন, গ্রেফতারের পর তাকে রাজশাহী মুখ্য মহানগর হাকিমের আদালতে হাজির করে ৩ দিনের রিমান্ডের আবেদন জানানো হলে আদালত ২ দিনের রিমান্ড মুঞ্জুর করেন। আশরাফুজ্জামান সোহেল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্র।
Friday, 1 June 2012
Friday, 25 May, 2012 2:38:52 PM
মানবতাবিরোধী অপরাধ: সাক্ষী
নিয়ে পাল্টাপাল্টি বিতর্ক
ফজলুল হক
নিজস্ব প্রতিবেদক
বার্তা২৪ ডটনেট
http://www.barta24.net/?view=details&data=Cook&web=0&menu_id=64&news_id=47280#.T8DF6m1R5Ls.facebook
ঢাকা, ২৫মে: মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আটক বিএনপি ও জামায়াত নেতাদের মানবতাবিরোধী অপরাধ বিচারের জন্য যে সব সাক্ষী আনার কথা ছিল, তাদেরকে আনতে না পারায় প্রসিকিউটদের নিয়ে নানা যুক্তি-তর্ক সৃষ্টি হয়েছে বিশেজ্ঞদের মাঝে।
বিশেষ করে জামায়াতের নায়েবে আমীর মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিচারের সাক্ষ্য গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়ে নানা প্রশ্ন তুলেছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।
তারা বলেছেন, সাক্ষীদের আদালতে হাজির করার ক্ষেত্রে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন রাষ্ট্রপক্ষের প্রসিকিউশন। তবে নিজেদের ব্যর্থতা ও অযোগ্যতা ঢাকতে তারা বিভিন্ন সময়ে নিচ্ছেন নানা কৌশল।
আইন বিশেষজ্ঞ ড. কামাল হোসেন, স্বাধীনতার প্রথম পতাকা উত্তোলক আ স ম রব, মুক্তিযুদ্ধে কাদেরিয়া বাহিনীর সর্বাধিনায়ক বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম, ওয়ার ক্রাইমস্ ফ্যাক্টস্ ফাইন্ডিং কমিটির আহবায়ক ডা. এম এ হাসান, ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির অন্যতম প্রধান শাহরিয়ার কবির প্রসিকিউশনের দক্ষতা ও সামর্থ্য নিয়ে যেসব প্রশ্ন তুলেছিলেন, সেগুলো বাস্তব হয়ে যাচ্ছে বলে মনে করছেন তারা।
সাঈদীর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ৬৮জন সাক্ষীর মধ্যে মাত্র ১৮ জনের পর আর বাকি সাক্ষীদের হাজির করতে না পেরে তদন্ত কর্মকর্তার কাছে দেয়া জবানবন্দীকে সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করতে আদালতে আবেদন এবং তা মঞ্জুর হওয়ার পর বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে গেছে বলে তারা মনে করছেন।
প্রগতিশীল রাজনীতিবিদ, সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ও বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধারা মনে করেন, এই বিচারকে বিতর্কিত করতেই এ ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। তাদের মতে, প্রসিকিউশন ও ট্রাইব্যুনালের এ ধরনের পদক্ষেপের কারণে জনগণের বহুল প্রত্যাশিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার যেমন বিতর্কিত হবে, তেমনি আন্তর্জাতিক মহলেও সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট হবে।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী আইনজীবীরাও বলেছেন, সাঈদীর বিরুদ্ধে সাক্ষী না আনতে পারলে প্রসিকিউশনের উচিত ছিল আদালতকে তা সাফ জানিয়ে দেয়া। কিন্তু সাক্ষী না এনে তদমত্ম কর্মকর্তার কাছে দেয়া বক্তব্যকে সাক্ষ্য হিসেবে দেখানোর কারণে আসামীদের পক্ষেথেকে ও বিচার হোক যারা না চায় তাদের মতো বিরোধী শক্তি বিতর্কের সুযোগ পেয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন তারা।
‘সাঈদীর সাক্ষ্যগ্রহণের সময় আমরা ন্যায়বিচার করবো না’ বলে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যানের দেয়া বক্তব্য নিয়েও ট্রাইব্যুনালে বাইরে এসে ডিফেন্সের পক্ষে থেকে ধূম্রজাল তৈরি করা হয়েছে। এই সব নিয়েও বিশিষ্টজনদের পক্ষ থেকে নানা মন্তব্য ও সমালোচনার চেষ্টা চালানো হচ্ছে বিরোধীদের পক্ষ থেকে।
এছাড়া, প্রসিকিউশন প্রখ্যাত কলাম লেখক ও বিশিষ্ট জাদুশিল্পীর সাক্ষ্যর বিষয়ে বেঠিক পন্থার আশ্রয় নিয়েছেন বলে তারা বলেন। বিশিষ্ট কলাম লেখক ও ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির নেতা শাহরিয়ার কবির সাঈদীর মামলার সাক্ষী না হলেও প্রসিকিউশন তাকে সাক্ষী হিসেবে উল্লেখ করলে তিনি আদালতে উপস্থিত হতে পারবেন না বলেও তাদের আবেদনে ট্রাইব্যুনালকে জানায় রাষ্ট্রপক্ষ।
এতে ভীষণ ক্ষুব্ধ হয়েছেন শাহরিয়ার কবির। তিনি বলেন, “আমি কখনোই সাঈদীর মামলার সাক্ষী ছিলাম না, কিন্তু এ বিষয়ে প্রসিকিউটররা আমার সঙ্গে প্রতারণা করেছেন। একই ঘটনা ঘটেছে প্রখ্যাত জাদুশিল্পী জুয়েল আইচ ও অধ্যাপক জাফর ইকবালের ক্ষেত্রেও।
কোনো ধরনের আলাপ আলোচনা ছাড়াই প্রসিকিউশন তাদেরকে ট্রাইব্যুনালে সাক্ষীর তালিকায় উপস্থাপন করে অনুপস্থিত দেখিয়েছে।
নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে জানা গেছে, প্রসিকিউশন সাঈদীর মামলায় অধ্যাপক জাফর ইকবালকে সাক্ষী করার জন্য বেশ কয়েক ধর্না দিলেও তিনি সাফ ‘না’ করে দিয়েছেন।
এক্ষেত্রে জাফর ইকবাল বলেছেন, “আমি চাই আমার বাবাকে যারা হত্যা করেছে তাদের বিচার হোক, কিন্তু এ ঘটনায় সাঈদী জড়িত কিনা, তা না জেনে আমি কিভাবে সাক্ষ্য দেবো।”
মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার সহায়ক মঞ্চের অন্যতম উপদেষ্টা বিচারপতি সৈয়দ আমিরুল ইসলাম বলেন, “সাক্ষী আনতে অবশ্যই তদন্ত কর্মকর্তা ও প্রসিকিউটরদের আন্তরিক থাকা উচিত, পুলিশের কাছে দেয়া বক্তব্যকে সাক্ষ হিসেবে গ্রহণ করা আইনীভাবে যথার্থ নয়।”
‘আমরা বিচার করবো না’ - ট্রাইব্যুনালের এমন মন্তব্যকেও সৈয়দ আমিরুল ইসলাম অনাকাঙ্ক্ষিত বলে মনে করেন।
সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদীন বলেছেন, “পুলিশের কাছে দেয়া বক্তব্যকে সাক্ষ্য হিসেবে নেয়া পৃথিবীর ইতিহাসে নজিরবিহীন, মধ্যযুগেও এ ধরনের ঘটনা ঘটেনি।”
আর, ‘আমরা সুবিচার করবো না’ বলে মন্তব্য করে ট্রাইব্যুনাল নিরপেক্ষতা হারিয়েছে বলে মনে করেন সুপ্রিম কোর্টের এই সিনিয়র আইনজীবী।
জয়নাল আবেদীন বলেন, “তদন্ত কর্মকর্তা তদন্ত প্রতিবেদনে সাক্ষীর নামে সরকারের মনগড়া কথাই লিখে দিয়েছেন। এখন সাক্ষী না পেয়ে এগুলোকেই সাক্ষ্য হিসেবে ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করে একটি প্রহসনের বিচারের আয়োজন চলছে।” এ ধরনের তৎপরতা আইনের শাসনের জন্য শুভ নয় বলে মন্তব্য জয়ানাল আবেদীনের।
কিংবদন্তী মুক্তিযোদ্ধা কাদের সিদ্দিকী বলেন, “আমরা বিচার করবো না- এ ধরনের বক্তব্য কোনো সভ্য সমাজে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।” তিনি বলেন, “মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নিয়ে সরকার রাজনীতি করছে বলে এই বিচারের কর্তাব্যক্তিরাই এ ধরনের মন্তব্য করছেন।”
তিনি আরো বলেন, “ভোটের রাজনীতিতে সুফল পেতেই মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করা হচ্ছে।” এ বিচারে সরকারের আন্তরিকতা নেই বলেও মন্তব্য করেছেন কাদের সিদ্দিকী। তার মতে, “সাক্ষীকে আদালতে না এনে পুলিশের কাছে দেয়া বক্তব্য জবানবন্দি হিসেবে নেয়ার ঘটনা বাংলাদেশে এই প্রথম ঘটলো। এর ফলে স্বাধীনতাবিরোধীদের হাতে বিতর্কের অস্ত্র তুলে দেয়া হলো।”
ইতোমধ্যে প্রধান বিরোধীদল বিএনপির পক্ষ থেকেও কঠোর ভাষায় ১৫ জনের বক্তব্যকে সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। এ বিষয়ে কথা বলতে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া স্থায়ী কমিটির তিন সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, এম কে আনোয়ার ও ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়াকে দায়িত্ব দিয়েছেন।
এমকে আনোয়ার সম্প্রতি ট্রাইব্যুনালের এসব আচরণকে জংলী হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, “পুলিশ কার কাছ থেকে কি বক্তব্য নিলো, সেটি যাচাই বাছাই বা জেরার সুযোগ না দিয়ে সরাসরি জবানবন্দি হিসেবে গ্রহণ করার নজির পৃথিবীর ইতিহাসের কোথাও নেই।” এ ধরনের বিচার মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হার মানিয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম বলেছেন, “আমরা বিচার করবো না, ট্রাইব্যুনালের এ ধরনের উক্তি হলো বর্বর উক্তি।” তিনি বলেন, “এর ফলে স্পষ্ট হয়ে গেছে, তারা ন্যায়বিচার করবেন না।”
জানা গেছে, মাওলানা সাঈদীর সাক্ষ্য আনা নিয়ে ইতোমধ্যে প্রসিকিউটররা কয়েক দফা বৈঠক করেছেন। বৈঠকে সাক্ষী না আনতে পারার পেছনে পাঁচটি কারণ তারা চিহ্নিত করেছেন। এর মধ্যে বড় একটি কারণ হলো, তদন্ত কর্মকর্তাদের ব্যর্থতা। কারণ ৪১ বছর আগের ঘটনাগুলোর সাথে তারা গ্রেফতারকৃত রাজনৈতিক নেতাদের কোনো সম্পৃক্ততা যথার্থভাবে দেখাতে পারছেন না। এজন্য, সংশ্লিষ্ট সাক্ষীও তারা আনতে পারছেন না।
সূত্রটি আরো জানিয়েছে, সাঈদীর সাক্ষী আনতে না পারার অভিজ্ঞতাকে সামনে রেখে বেশ কিছু কৌশল তারা হাতে নিয়েছেন। তবে ডিফেন্স টিমের দাবি হচ্ছে, সাঈদীর মামলার মতো অন্য অভিযুক্তদের ক্ষেত্রেও পুলিশের কাছে দেয়া বক্তব্যকেই তারা সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করার চেষ্টা করছেন। আর সাঈদীর মাধ্যমেই তা জায়েজ করে পরবর্তীদের জন্যও একই আবেদন করার মাধ্যমে প্রসিকিউটররা আরো বেশি সমালোচনায় পড়েছেন।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী এমপি ও জামায়াতের সাবেক আমীর গোলাম আযম, বর্তমান আমীর মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর ক্ষেত্রে এ ধরনের প্রস্তুতি চলছে বলে আসামিপক্ষের দাবি।
এক্ষেত্রে বিশেষ করে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও মতিউর রহমান নিজামীর নিজামীর নির্বাচনী এলাকায় সাক্ষীদেরকে হুমকি দিচ্ছেন বলে জানিয়েছেন রাষ্ট্রপক্ষের প্রসিকিউটররা।
তবে যাদেরকে প্রাথমিকভাবে সাক্ষী হিসেবে তালিকাভুক্ত করার চিন্তা করেছিল প্রসিকিউশন, তারাও কোনো ধরনের সহযোগিতা করছে না বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সূত্রের দাবি।
ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির অন্যতম নেতা শাহরিয়ার কবির বার্তা২৪ ডটনেটের সঙ্গে আলাপ কালে প্রসিকিউশনের এসব তৎপরতায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তবে তিনি বলেছেন, “আমি পরিষ্কার করে প্রসিকিউশন ও তদন্ত কর্মকর্তাকে বলেছি যে একজনের বিষয়ে সাক্ষী দেব ট্রাইব্যুনালে এবং সেটি আপনাকেও বলেছি।”
এ সময় তিনি বলেন, “মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আটক প্রত্যেকের এলাকাতেই অনেক সাক্ষী পাওয়া যাবে। তারা তাদের সংশ্লিষ্ট এলাকা থেকে সাক্ষী হিসেবে অনেককেই আনবেন বলে আমার ধারণা। তাদের মধ্যে অনেকেই প্রত্যক্ষদর্শী ও প্রকৃত ভিকটিম রয়েছেন।”
এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ট্রাইব্যুনালে আটক জামায়াত নেতা মাওলানা দেলাওয়ার হোসাঈন সাঈদীর বিরুদ্ধে ১৫ সাক্ষীর তদন্ত কর্মকর্তার কাছে দেয়া জবানবন্দি সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করার আদেশর পর ডিফেন্সের রিভিয়ু আবেদন শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষে ও আসামি পক্ষ পাল্টা-পাল্টি যুক্তি তর্ক উপস্থাপন করেছেন।
বার্তা২৪ ডটনেট/এফএইচ/জিসা
Sunday, 1 January 2012
ইশতেহারের সিকিভাগও বাস্তবায়ন হয়নি

এমরান হোসাইন
ক্ষমতাসীন সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ও তা বাস্তবায়নের মধ্যে রয়েছে বিস্তর ব্যবধান। পাঁচ বছর মেয়াদি সরকারের ৩ বছরে নির্বাচনী ইশতেহারের সিকিভাগও বাস্তবায়ন করতে পারেনি আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম কমানো, পদ্মা সেতু নির্মাণ, রাজধানীর যানজট নিরসন, দুর্নীতি রোধ, বিচারবহির্ভূত হত্যা বন্ধ, মন্ত্রী-এমপিদের সম্পদের হিসাব জনসম্মুখে প্রকাশ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত, প্রশাসনকে দলীয়করণমুক্ত, পুঁজিবাজারের বিকাশ, প্রতিবেশী দেশের কাছ থেকে পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়সহ শত প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি দিলেও তিন বছরের মধ্যে এগুলো পূরণ হয়নি। রংপুরকে বিভাগ করা, প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিশ্চিতকরণ, জাতীয় শিক্ষানীতি ও নারীনীতি প্রণয়নসহ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কিছু প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হলেও এগুলো নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলের তীব্র আপত্তি রয়েছে। সরকারের বাকি দু’বছরে এসব প্রতিশ্রুতি পূরণ নিয়ে খোদ সরকারের মধ্যেই সংশয় রয়েছে। পদ্মা সেতু, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ৪ লেনে উন্নীতকরণসহ কিছু কিছু প্রকল্পের নাম উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীরা জানিয়ে দিয়েছেন, তারা শুরু করতে পারলেও সরকারের চলতি মেয়াদে এসব প্রকল্পের কাজ শেষ করতে পারবেন না। এদিকে নির্বাচনের আগে জনগণকে দেয়া এসব ওয়াদা পূরণে সরকারের নজর না থাকলেও সরকারদলীয়দের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ও বিরোধী দলের প্রতি নিপীড়নমূলক অনেক কিছুই বাস্তবায়িত হয়েছে অনেকটা তড়িঘড়ি করে। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারেও রয়েছে শুভঙ্করের ফাঁকি। ২০১৪ সালের ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত ক্ষমতার মেয়াদ হলেও এই সরকার তার ইশতেহারের বেশিরভাগ প্রতিশ্রুতি ২০২১ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের সময়সীমা নির্ধারণ করেছে।
গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ২০০৮ সালের ১২ ডিসেম্বর ঢাকার শেরাটন হোটেলে (বর্তমানে রূপসী বাংলা) এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ‘দিনবদলের সনদ’ নামে ২৪ পৃষ্ঠার একটি নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেন বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। ইশতেহারের লিখিত প্রতিশ্রুতির বাইরেও নির্বাচনী বক্তৃতায় জনগণকে ১০ টাকা কেজিতে চাল খাওয়ানো, কৃষকদের বিনামূল্যে সার প্রদানসহ বেশকিছু বিষয়ে ওয়াদা দেন শেখ হাসিনা। কিন্তু ক্ষমতার আসার পর সরকার এসব মৌখিক ওয়াদা অস্বীকার করার পাশাপাশি ইশতেহারে প্রদত্ত প্রতিশ্রুতির বিষয়েও কোনো অগ্রগতি নেই।
আওয়ামী লীগ তার নির্বাচনী ইশতেহারে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিল দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি প্রতিরোধ করার ক্ষেত্রে। ইশতেহারের অগ্রাধিকারের ৫টি বিষয়ের প্রথমটিতে বলা হয়—চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম কমিয়ে জনগণের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে স্থিতিশীল রাখার ব্যবস্থা করা হবে। প্রধান এই প্রতিশ্রুতি পূরণেও তারা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। জিনিসপত্রের দাম কমানো তো দূরের কথা, এগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখতেও ব্যর্থ হয়েছে। গত তিন বছরে প্রতিটি জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে লাগামহীনভাবে। জিনিসপত্রের দামের জন্য জনগণের দুর্ভোগের কথা সম্প্রতি স্বীকার করেছেন সরকারের সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী ফারুক খান। দফতর বদলে বেসরকারি বিমান চলাচলমন্ত্রী হওয়ার পর আগের দায়িত্ব পালনে নিজের মূল্যায়ন করতে গিয়ে তিনি অকপটে স্বীকার করেন, তার অনেক ক্ষেত্রে সফলতা থাকলেও দ্রব্যমূল্যের জন্য দেশের মানুষ কষ্ট পেয়েছেন।
সরকার ক্ষমতা গ্রহণের সময় মোটা চালের কেজিপ্রতি মূল্য ২৫ থেকে ২৭ টাকার মধ্যে থাকলেও বর্তমানে এর দাম ৩৫ থেকে ৩৭ টাকার মধ্যে। ওই সময়ে নাজিরশাইল চালের দাম ৪০ থেকে ৪২ টাকা থাকলেও বর্তমানে এর বাজারদর ৫৪ থেকে ৫৭ টাকা। ২৩ টাকা কেজির আটা এখন ৩০ টাকা। ৩০ টাকা কেজির চিনি হয়েছে ৬৫ টাকা। ৯০ টাকা দরের সয়াবিন তেলের দাম বেড়ে ১৩৫ টাকা। অন্যান্য জিনিসপত্রের দামও সমহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এদিকে ইশতেহারে জিনিসপত্রের মূল্য বৃদ্ধির সঙ্গে ‘জড়িত’ সিন্ডিকেট ভেঙে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সরকার এক্ষেত্রে কোনো সফলতা অর্জন করতে পারেনি। বরং তথাকথিত ওই সিন্ডিকেট এখন খোলস পাল্টে সরকারের ছত্রছায়ায় সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।
ক্ষমতাসীন সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে সড়ক, রেল, নৌ, বিমান পরিবহন ব্যবস্থাকে ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণের কথা বলা হয়েছে। এক্ষেত্রে পদ্মা সেতু ও কর্ণফুলী সেতু, টানেল নির্মাণ, ঢাকা-চট্টগ্রাম ৪ লেনবিশিষ্ট এক্সপ্রেস সড়ক নির্মাণে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং রেলপথ সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এখন পর্যন্ত এর কিছুই হয়নি। ক্ষমতা গ্রহণের পর পদ্মা সেতুকে সরকার তার প্রধান অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত প্রকল্প উল্লেখ করে কার্যক্রম শুরু করে। গত তিন বছরে এর পেছনে সরকারের খরচও হয় প্রায় এক হাজার ২০০ কোটি টাকা। কিন্তু সেতুর দরপত্র প্রক্রিয়াকালে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় এ সেতু নির্মাণে ঋণদাতা সংস্থা বিশ্বব্যাংক ঋণ স্থগিত করে। বিশ্বব্যাংকের দেখাদেখি এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক ও জাইকাও ঋণ সহায়তা বন্ধ রেখেছে। দুর্নীতির কারণে যোগাযোগমন্ত্রী আবুল হোসেনকে এ মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়েও দেয়া হয়। বর্তমানে এ সরকারের মেয়াদে পদ্মা সেতু নির্মাণের কোনো সম্ভাবনাই নেই।
সরকার ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ককে ৪ লেনে উন্নীত করার প্রকল্প হাতে নিলেও ৩ বছর মেয়াদি এ প্রকল্পের ১৯ মাসে কাজ হয়েছে মাত্র ৬ শতাংশ। বাকি ১৭ মাসে এ কাজ শেষ করা সম্ভব নয় বলে খোদ সরকারের তরফ থেকে জানানো হয়েছে। এ প্রকল্পের বিষয়ে নতুন যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের জানিয়েছেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহসড়ক ৪ লেনে উন্নীতকরণের ক্ষেত্রে তারা মাত্র ৪২ কিলোমিটার অংশ দৃশ্যমান করতে পারবেন। উল্লেখ্য, সড়কপথে ঢাকা-চট্টগ্রামের দূরত্ব ২৮০ কিলোমিটার।
আওয়ামী লীগের ইশতেহারে রাজধানী ঢাকার যানজট নিরসনে ডজনখানেক প্রকল্পের প্রতিশ্রুতি থাকলেও তার কোনোটিই বাস্তবায়ন হয়নি। ইশতেহারে ঢাকায় পাতাল রেল/মনোরেল, সার্কুলার রেলপথ এবং এলিভেটেড (উড়াল সড়ক) রাস্তা নির্মাণ করে গণপরিবহন সমস্যার সমাধান, ঢাকার চতুর্দিকে বৃত্তাকার (অরবিটাল) জলপথ, বেড়িবাঁধ, সড়ক, রেলপথ নির্মাণ করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। এ বছরের এপ্রিল মাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ কাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করলেও এখন পর্যন্ত এ কাজের অগ্রগতি কেবল ওই ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনই! এ এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে টেন্ডারের দেন-দরবারের ক্ষেত্রে সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী আবুল হোসেনের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। মেট্রোরেল স্থাপন প্রকল্পটি আটকে গেছে এর রুট ঠিক করার মধ্যে। এর রুট নিয়ে বিমানবাহিনী, সংসদ ভবন কর্তৃপক্ষ ও সরকারের মধ্যে রশি টানাটানি চলছে।
মহাজোট সরকার তার বিদ্যুত্ খাতে সবচেয়ে সফল বলে দাবি করলেও তিন বছরে তার প্রতিশ্রুতির অর্ধেক বিদ্যুত্ও উত্পাদন করতে পারেনি। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে ২০১১ সাল নাগাদ ৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদনের প্রতিশ্রুতি দিলেও এ সময়ে তারা আড়াই হাজার মেগাওয়াটের মতো বিদ্যুত্ উত্পাদন করতে পেরেছে বলে দাবি করছে। তবে এ সময় অনেক পুরনো বিদ্যুেকন্দ্রে উত্পাদন উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে।
এদিকে সফলতার (সরকারের দাবি মতে) এ বিদ্যুত্ খাত এখন সরকারের গলায় কাঁটা হয়ে বিঁধছে। বিনা টেন্ডারের সঙ্গে রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল উচ্চমূল্যে বিদ্যুত্ ক্রয় করতে গিয়ে সরকারকে বড় অংকের ভর্তুকি গুনতে হচ্ছে। সরকারি তথ্যমতে, জ্বালানিভিত্তিক রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুেকন্দ্র হতে বিদ্যুত্ ক্রয়ের জন্য চলতি অর্থবছরের প্রথম দু’মাসে (জুলাই-আগস্ট) ১ হাজার ২৩৭ কোটি ৬৯ লাখ টাকা ভর্তুকি দিতে হয়েছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে শুধু বিদ্যুত্ খাতেই সরকারকে বছরে সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হবে। তেল ও গ্যাস খাত মিলিয়ে এ ভর্তুকি ৩০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে সরকারি সূত্র জানিয়েছে। সরকারের এই অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্তের কারণে মাশুল দিতে হচ্ছে দেশের সাধারণ মানুষকে। বিদ্যুত্ খাতের দুর্নীতি থেকে সরকারি কর্মকর্তাদের রেহাই দিতে সরকার এ সংক্রান্ত একটি ইনডেমনিটি বিলও সংসদে পাস করেছে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর কয়েক দফায় প্রতিটি জ্বালানির দাম বৃদ্ধি করা হয়েছে। এর মধ্যে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে ৩ দফায়। গ্যাসের দাম বাড়ানো হয় দু’দফায় আর সম্প্রতি বাড়ানো হয়েছে বিদ্যুতের দাম। প্রতিবেশী দেশ ভারতসহ বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমলেও মহাজোট সরকার গত ৬ মাসে তিন দফায় তেলের দাম বাড়িয়েছে। ইশতেহারে আওয়ামী লীগ জাতীয় কয়লানীতি প্রণয়ন করার কথা বললেও এখনও পর্যন্ত তা হয়নি।
আওয়ামী লীগের ইশতেহারে বলা হয়েছে, ২০০৫ সালের ১৫ জুলাই ঘোষিত ১৪ দলের ৩১ দফা সংস্কার কর্মসূচি এবং ২২ নভেম্বর গৃহীত ২৩ দফা অভিন্ন ন্যূনতম কর্মসূচির আলোকে এবং বিগত ৭ বছরের অভিজ্ঞতা ও বাস্তবতাকে বিবেচনায় রেখে এই কর্মসূচি (ইশতেহার) প্রণীত হয়েছে। ১৪ দলের ৩১ দফা ও ২৩ দফার প্রধান দাবি ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংস্কারের বিষয়টি। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের স্বার্থে প্রণীত এই তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থাই পুরোপুরি বাতিল করে দিয়েছে বর্তমান সরকার। উচ্চ আদালতের একটি রায়ের ওপর ভর করে দেশের জনমত উপেক্ষা করে তড়িঘড়ি করে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বিলুপ্ত করে এই সরকার। এমনকি সরকারের শরিকদের অনেকেই এ ব্যবস্থা বাতিলের বিরুদ্ধে ছিলেন। হাইকোর্ট আগামী দুই মেয়াদের জন্য তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বহাল রাখার প্রতি মত দিলেও সরকার তা গ্রহণ করেনি। এ ক্ষেত্রে আদালতের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের সময়টাও দেয়নি সরকার।
আওয়ামী লীগ তার ইশতেহারে অগ্রাধিকারের ২নং ধারায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দিলেও তাদের প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল নেই। দুর্নীতি দমন কমিশনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে শক্তিশালী করার কথা বললেও এ সরকারের হাতেই এর স্বাধীনতা খর্ব হতে চলেছে। সরকার দুর্নীতি দমন কমিশন সংশোধনের লক্ষ্যে সংসদে যে বিল উত্থাপন করেছে তাতে কমিশনের স্বাধীনতা ভূলুণ্ঠিত হবে বলে সংশ্লিষ্টরা বলছেন। বর্তমান কমিশনের চেয়ারম্যান গোলাম রহমান নিজের ক্ষমতা সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছেন, দুদক নখরবিহীন বাঘে পরিণত হয়েছে। প্রকৃত দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দুর্নীতি দমন কমিশন কোনো ভূমিকা রাখতে না পারলেও বিরোধী মতের হয়রানিতে সরকারের আজ্ঞাবহ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে ‘স্বাধীন’ এ কমিশন। আসল দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ না নিতে পারলেও বিরোধীদলীয় মতের কারও কারও বিরুদ্ধে দুর্নীতির নামগন্ধ পেলেই তার বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লাগছে প্রতিষ্ঠানটি।
ইশতেহারের অগ্রাধিকারের ৫নং ধারায় বিচার বিভাগের প্রকৃত স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, স্বাধীন মানবাধিকার কমিশন গঠন, ন্যায়পাল নিয়োগ, মানবাধিকার লঙ্ঘন কঠোরভাবে বন্ধ করার কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে নামকাওয়াস্তে মানবাধিকার কমিশন গঠন ছাড়া আর কোনো কিছুই করতে পারেনি সরকার। মানবাধিকার কমিশন গঠন হলেও এ প্রতিষ্ঠানটি স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে না বলে এর কর্তাব্যক্তিরা জানিয়েছেন। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা তো দূরের কথা, বিচার বিভাগ দলীয়করণে অতীতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ হয়েছে। বর্তমান সরকারের সময়ে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে পদে পদে। বিচারবহির্ভূত হত্যা বন্ধের পরিবর্তে এটা আরও বেড়ে চলেছে। এর সঙ্গে নতুন সংস্করণ হিসেবে যুক্ত হয়েছে গুপ্তহত্যা। ন্যায়পাল নিয়োগ তো হয়ইনি, বরং বিগত চারদলীয় জোট সরকার যে কর ন্যায়পাল নিয়োগ দিয়েছিল এ সরকার তা বাতিল করেছে।
ইশতেহারে নির্বাচন কমিশন এবং নির্বাচন পদ্ধতির সংস্কারের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু সরকারের কার্যক্রমে তার প্রতিফলন দেখা যায়নি। নির্বাচন কমিশন থেকে একটি সংস্কার প্রস্তাব সরকারের কাছে প্রস্তাবাকারে জমা দিলেও তা অগ্রাহ্য করা হয়েছে।
জাতীয় সংসদকে কার্যকর ও সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার কথা বললেও মহাজোট সরকার এ প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি। সংসদ কার্যকর হওয়ার পরিবর্তে এটা পরিণত হয়েছে বিরোধী দলের বিরুদ্ধে বিষোদগার ও সরকারি দলের স্তুতিবন্ধনের কেন্দ্রস্থলে। বিরোধী দলকে সংসদে আনার ব্যাপারে সরকারের কোনো কার্যকর তত্পরতা নেই। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা সংক্রান্ত কতিপয় সুনির্দিষ্ট বিষয় ছাড়া সংসদ সদস্যদের ভিন্নমত প্রকাশের অধিকার দেয়ার কথা বলা হলেও তার বাস্তবায়ন হয়নি। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর আগে বিশেষ কমিটিতে এ ধরনের প্রস্তাব এলেও অজ্ঞাত কারণে তা গৃহীত হয়নি। জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংখ্যা ৩৩ শতাংশে উন্নীত তথা সংসদে প্রত্যক্ষ ভোটে নারীর জন্য ১০০ আসন সংরক্ষিত করার প্রতিশ্রুতি থাকলেও বিগত জোট সরকার সংরক্ষিত যে ৪৫টি আসন করেছিল তার থেকে মাত্র ৫টি বাড়িয়ে ৫০টি করেছে এই সরকার। আর এক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ ভোটের প্রতিশ্রুতি থাকলেও এ সরকার তা বাস্তবায়ন করেনি।
আওয়ামী লীগ তার নির্বাচনী ইশতেহারে সরকারের প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভার সদস্য এবং সংসদ সদস্য ও তাদের পরিবারের সম্পদের হিসাব ও আয়ের উত্স প্রতিবছর জনসমক্ষে প্রকাশ করার প্রতিশ্রুতি থাকলেও গত ৩ বছরে একবারও সম্পদের হিসাব জনসম্মুখে প্রকাশ করা হয়নি। তবে নানামুখী চাপে সম্প্রতি মন্ত্রিসভার সদস্যদের সম্পদের হিসাব জনসম্মুখে প্রকাশের পরিবর্তে প্রধানমন্ত্রীর কাছে জমা দেয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।
ইশতেহারে ২০১৩ সালের মধ্যে দারিদ্র্যসীমা ও চরম দারিদ্র্যের হার যথাক্রমে ২৫ ও ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনার কথা বলা হলেও তিন বছরে এক্ষেত্রে উল্লেখ করার মতো কোনো অর্জন সরকারের নেই। বেকারত্ব বেড়ে হয়েছে দ্বিগুণ। বর্তমানে দেশে প্রায় ৪ কোটি লোক বেকার বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে।
ইশতেহারে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে শিষ্টাচার ও সহিষ্ণুতা গড়ে তোলার কথা বলা হলেও ঘটেছে উল্টোটা। বিরোধী দল থেকে কোনো কর্মসূচি দেয়া হলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার নামে তাদের কর্মসূচিতে বাধা দেয়া হচ্ছে হরহামেশাই। বিরোধী দল দমনে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি সরকার দলীয় ক্যাডারদেরও মাঠে দেখা যাচ্ছে। অপরদিকে সরকারি দলের কর্মসূচি চলছে পুলিশি প্রটেকশনে।
ইশতেহারে আওয়ামী লীগ দলীয়করণমুক্ত অরাজনৈতিক গণমুখী প্রশাসন প্রতিষ্ঠা এবং যোগ্যতা, জ্যেষ্ঠতা ও মেধার ভিত্তিতে সব নিয়োগ ও পদোন্নতি নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিলেও সরকারে গিয়ে তা বেমালুম ভুলে গেছে। গত তিন বছর প্রশাসনে চলেছে নগ্ন দলীয়করণ। মেধা যোগ্যতার পরিবর্তে দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে হয়েছে পদোন্নতি ও বদলি। অপরদিকে সরকার দলের আনুগত্যে বিশ্বাসী নয়, এমন অজুহাতে অনেক মেধাবী ও দক্ষ কর্মকর্তাকে দিনের পর দিন ওএসডি করে রেখেছে। কাউকে কাউকে দেয়া হয়েছে বাধ্যতামূলক অবসর। ইশতেহারে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য স্থায়ী বেতন কমিশন গঠন করার কথা বলা হলেও তিন বছরে এ বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি।
ইশতেহারে ২০১৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার কথা বলা হলেও দেশের খাদ্য ঘাটতি বেড়েই চলেছে। গত তিন বছরে রেকর্ড পরিমাণ খাদ্যশস্য বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়েছে সরকারকে।
নির্বাচনী ইশতেহারে পরিবেশ ও পানিসম্পদ রক্ষায় কার্যকর আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিলেও সরকার নিজের স্বার্থ রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে। প্রতিবেশী দেশ ভারতকে ট্রানজিটের নামে করিডোর দিয়েছে। পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ের প্রতিশ্রুতি দিলেও করতে পারেনি তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি। বাংলাদেশের প্রাপ্যতা, হিস্যা ও যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে বিদ্যমান পানি সঙ্কট মোকাবিলায় বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও ভুটানসহ একটি সমন্বিত পানিনীতি প্রণয়ন এবং আঞ্চলিক পানি নিরাপত্তা গড়ে তুলতে আওয়ামী লীগ উদ্যোগী ভূমিকা গ্রহণ করবে বলে ইশতেহারে প্রতিশ্রুতি দিলেও, এ বিষয়ে ৩ বছরে সরকারের কোনোই উদ্যোগের খবর পাওয়া যায়নি।
প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সরকার একটি শিক্ষানীতি প্রণয়ন করলেও এটা নিয়ে রয়েছে সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর তীব্র আপত্তি। ইশতেহারে এক বছরের মধ্যে (২০১০ সালের মধ্যে) প্রাথমিক স্তরে নিট ভর্তি ১শ’ শতাংশে উন্নীত করার কথা বলা হলেও ৩ বছরে তা করতে পারেনি এ সরকার। শিক্ষাঙ্গনকে দলীয়করণমুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। গত ৩ বছর ধরে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চলেছে সরকার দলীয় ছাত্র সংগঠনের দখলের মহোত্সব। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষক নিয়োগে হয়েছে চরম দলীয়করণ। শিক্ষকদের জন্য উচ্চতর বেতন কাঠামো ও স্থায়ী বেতন কমিশন গঠন এবং স্বতন্ত্র কর্মকমিশন গঠনের কথা বলা হলেও ৩ বছর ধরে সরকার এটা নিয়ে কেবল ঘোষণার মধ্যে রয়েছে। স্নাতক পর্যন্ত শিক্ষাকে অবৈতনিক করার প্রতিশ্রুতিও এখন পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি। রাজধানী ঢাকার প্রতি থানায় সরকারি মাধ্যমিক হাইস্কুল ও প্রতি উপজেলায় সরকারি মাধ্যমিক স্কুল প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুুতিও পূরণ করতে পারেনি সরকার।
ইশতেহারে জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি নবায়ন, ওষুধনীতি যুগোপযোগী ও প্রতিরক্ষানীতি প্রণয়নের কথা থাকলেও তা হয়নি। প্রতিশ্রুতি অনুসারে ১৯৯৭ সালে আওয়ামী লীগ সরকার কর্তৃক প্রণীত নারীনীতি পুনর্বহাল করা হলেও এটা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলের তীব্র আপত্তি রয়েছে।
আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে বড় ধরনের ফাঁক রয়েছে। ইশতেহারের পরিশিষ্ট অংশে রূপকল্প (ভিশন) অনুযায়ী বাস্তবায়নের সময়সীমা বেঁধে দিয়ে যে ২৩টি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে তা অনেকটাই প্রতারণার শামিল। আওয়ামী লীগ যে ২৩টি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে তার মধ্যে মাত্র ৭টি সরকারের মেয়াদে অর্থাত্ ২০১৩ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। বর্তমান সরকারের মেয়াদ ২০১৪ সালের ২৫ জানুয়ারি শেষ হওয়ার কথা হলেও ইশতেহারে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী প্রতিশ্রুতির বেশিরভাগই এই সরকারের মেয়াদের পরে বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে ১৩টির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২১ সাল পর্যন্ত, যা বাস্তবায়নে আরও দুটি সরকারের প্রয়োজন হবে। তবে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সরকার প্রবাসীদের ভোটাধিকার প্রদান, রংপুরকে বিভাগে উন্নীতকরণ ও বিগত আওয়ামী লীগ আমলের কমিউনিটি ক্লিনিক পুনরায় চালু করেছে।
Saturday, 31 December 2011
বাঁকা চোখে : বোবাদের নিয়ে ড. কামালের মহাচিন্তা

স্টাফ রিপোর্টার
ড. কামাল হোসেন মনে করেন বর্তমান সংসদ একটি বোবা সংসদ। সংসদের সব এমপিও বোবা। এই বোবা সংসদ ও এমপিদের নিয়েই তার যত দুশ্চিন্তা। দুশ্চিন্তা আর আক্ষেপের কথা প্রকাশ করে গণফোরাম সভাপতি এই আইনজীবী বলেছেন, সারাদেশের ভোটারদের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত তিনশ’ সদস্য নিয়ে জাতীয় সংসদ গঠিত হলেও এখানে মূলত একজনের (প্রধানমন্ত্রী) ইচ্ছা-অনিচ্ছা আর আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটে। সংসদ নেতা বা প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে যেতে পারে—এ ভয়ে অন্যান্য সদস্য কথাই বলেন না। তিনি বলেন, সংসদে তিনশ’ লোক বোবার মতো বসে থাকে। কাজেই এটি একটি বোবা সংসদ। প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছায় ৪ মিনিটে ঢাকা ভাগ বিল পাস ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে সংবিধান সংশোধনী বিল পাস হয় এই সংসদে। দেশের শেয়ারবাজার থেকে লাখ লাখ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীর হাজার হাজার কোটি টাকা লুট হয়ে গেল, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে দিশাহারা দেশের মানুষ, সন্ত্রাস-চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজিতে নাকাল ব্যবসায়ীরা অথচ বোবা সংসদ সদস্যরা এ নিয়ে সংসদে টুঁ শব্দটিও করেন না। গত ১০ ডিসেম্বর গণফোরামের কাউন্সিল অধিবেশনে সভাপতির বক্তব্যে এমন উপলব্ধির কথাই বর্ণনা করেন প্রবীণ এই আইনজ্ঞ।
দেশের বিশিষ্ট নাগরিক ও রাজনীতিবিদদের উপস্থিতিতে রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ওই অনুষ্ঠানে গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন এমপিদের উদ্দেশে আরও বলেন, মাত্র ৪ মিনিটে ঐতিহ্যবাহী ঢাকা শহর দুই ভাগ করার বিল জাতীয় সংসদে পাস হয়ে গেল। নজিরবিহীন এ ঘটনার সময় আপনারা সবাই চুপ করে বসে থাকলেন। কেউ মুখ খুলে পক্ষে কিংবা বিপক্ষে একটি যুক্তিও দেয়ার সাহস পেলেন না। লাখ লাখ যুবকের সর্বনাশ করে শেয়ারবাজারের মুলধন লুট হয়ে গেল অথচ আপনারা সাহস করে কেউ একটি কথাও বললেন না। আপনারা সবাই বোবা হয়ে বসে থাকলেন অথচ মহান আল্লাহতায়ালা চোখ দিয়েছেন দেখার জন্য, কান দিয়েছেন শোনার জন্য আর মুখ দিয়েছেন অন্যায়ের প্রতিবাদ করার জন্য। আপনারা সংসদে কিছুই বললেন না। তিনি এমপিদের উদ্দেশে প্রশ্ন করে বলেন, আল্লাহ কি আপনাদের বোবা করে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন?
জাতীয় সংসদ নিয়ে খ্যাতিমান আইনজীবী ড. কামাল হোসেনের এই মন্তব্যের আগেও সুপ্রিমকোর্টের একজন বিচারপতি বোবা সংসদের বিষয়ে বলেছেন, জাতীয় সংসদে এমপিদের দায়িত্ব হচ্ছে আইন প্রণয়ন করা। অথচ জাতীয় সংসদে যারা যাচ্ছেন, তারা আইন সম্পর্কে কিছুই জানে না। তারা শুধু ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ বলা ছাড়া আর কিছুই জানেন না। আইন মন্ত্রণালয় থেকে কেরানিরা যে ড্রাফট করে দেন, জাতীয় সংসদে এমপিরা তা টেবিল চাপড়ে হো হো করে পাস করে দেন। উত্থাপিত আইনের খসড়া জাতির কতটুকু উপকারে আসবে এটা দেখা বা ভাবার সময় তারা পান না।
http://www.amardeshonline.com/pages/details/2011/12/17/122523
Friday, 9 December 2011
র্যাব পুলিশের নামে গুম ব্যক্তিদের খোঁজ মেলেনি

আলাউদ্দিন আরিফ
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয় দিয়ে গুম অব্যাহতভাবে বেড়েই চলছে। চলতি বছরের শেষ দিনগুলোতে কমপক্ষে ১০০ ব্যক্তি গুম হয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। অপহরণ ও গুম হওয়া ব্যক্তিদের কিছু ক্ষেত্রে লাশ উদ্ধার হচ্ছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে খোঁজই মিলছে না। এ পরিস্থিতিতে মানুষের মধ্যে দেখা দিয়েছে গুম ও অপহরণ আতঙ্ক। প্রশ্ন উঠেছে এরপর টার্গেট কে? ওয়াকিবহাল ব্যক্তিরা বলছেন, আজ ১০ ডিসেম্বর বিশ্ব মানবাধিকার দিবস। এ সময়েও গুম হয়ে যাওয়া এসব মানুষের স্বজনরা দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন প্রিয়জনদের সন্ধানে। আইনশৃঙ্খলা
রক্ষাকারী বাহিনীর অফিস, মানবাধিকার সংস্থার অফিস, রাজনৈতিক নেতার দফতর, পত্রিকার অফিস থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্থানে ধর্না দিয়েও স্বজনের কোনো খোঁজ পাচ্ছেন না তারা। জানতে পারছেন না তাদের স্বজন বেঁচে আছে না মরে গেছে। গুম হওয়া ব্যক্তিরা জীবিত না থাকলে তাদের অন্তত লাশ ফেরত চাইছেন তারা সংবাদ সম্মেলন করে। সে অধিকারটুকু থেকেও তারা আজ বঞ্চিত।
বিশিষ্টজনরা বলেন, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে মানবাধিকার উঠে গেছে আমাদের দেশ থেকে। মানুষের বেঁচে থাকারও অধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছে। রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে ক্রসফায়ার, এনকাউন্টার, বন্দুকযুদ্ধসহ নানা নামে চলছে মানুষ হত্যা। র্যাব-পুলিশ পরিচয়ে তুলে নেয়ার পর মাসের পর মাস পেরিয়ে গেলেও গুম হওয়া ব্যক্তির হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। এ অবস্থায় দেশে মানবাধিকারের বাণী এখন নিভৃতে কাঁদছে।
জানা গেছে, ২৬ অক্টোবর থেকে ২০ নভেম্বর পর্যন্ত এক মাসেরও কম সময় শুধু মতিঝিল থেকেই ৭ জন গুম হওয়ার বিষয়ে মামলা ও জিডি হয়েছে। তাদের মধ্যে ৬ জনের নাম জানা গেছে। এরা হলেন, ফেনীর সোনাগাজী উপজেলা যুবলীগ নেতা সারোয়ার জাহান বাবুল, ভোলার দিদার, বাহার ও জসিম, রামপুরার আরিফ ও মতিঝিলের জুয়েল। র্যাব পরিচয়ধারীদের হাতে গত ২৮ অক্টোবর হাতিরপুল থেকে গুম হয়েছেন ঢাকা বিশ্বদ্যািলয়ের ছাত্র শামীম হাসান সোহেল, ৪১ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ সভাপতি নূর মোহাম্মদ হাজী ওরফে নুরু হাজী, তার জামাতা আবদুল মান্নান ও জামাতার ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি ইকবাল। নুরু হাজী গুম হওয়ার দেড় মাসের মাথায় গুম হয়েছেন মান্নান ও ইকবাল। কোরবানীর ঈদের পরদিন সূত্রাপুর থেকে গুম হয়েছেন ব্যবসায়ী মমিন হোসেন। গুম হয়েছেন গার্মেন্ট ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম, বরিশালের উজিরপুরের বিএনপি নেতা ও ঢাকার ব্যবসায়ী হুমায়ন খান। এছাড়া ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে গত কয়েক মাসে বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পরিচয়দানকারীদের হাতে গুম হয়েছেন। র্যাব পুলিশ রহস্যজনক কারণে এসব গুমের মামলা তদন্ত করছে না। তাদের পরিবারের লোকজনও জানতে পারছে না যে তারা বেঁচে আছে না মরে গেছে।
গত ২৮ নভেম্বর গুম হয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) ছাত্র ও ছাত্রদল নেতা শামীম হাসান সোহেল। গুম হওয়ার ১২ দিন পরও তার সন্ধান মেলেনি। সোহেলের মা, ভাইসহ আত্মীয়স্বজনরা অভিযোগ করেছেন, সাদা পোশাকে র্যাব পরিচয় দিয়ে তাকে ধরে নেয়া হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতিতে এক সংবাদ সম্মেলনে সোহেলের ভাই সাইমুন ইসলাম জানান, গত ২৮ নভেম্বর রাত ১০টায় সোহেলের সঙ্গে সর্বশেষ তার মোবাইল ফোনে কথা হয়েছে। ওই সময় সোহেল জানায় সে শাহবাগে আছে। এরপর থেকে তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়েছে, ২৮ নভেম্বর রাত ১২টার দিকে হাতিরপুল এলাকা থেকে সাদা পোশাকে র্যাব সদস্যরা সোহেলকে তুলে নিয়ে যায়। তার সঙ্গে আরও চারজনকে তুলে নিয়ে যায় তারা। সোহেল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইইআরে ২০০০-০১ সেশনে অনার্সে ভর্তি হন। ২০০৮ সালে অনার্স পাস করেন তিনি। বর্তমানে তিনি ওই ইনস্টিটিউটের মাস্টার্সের ছাত্র। ছাত্রদলের সূর্যসেন হল শাখার তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক সোহেল। তার গ্রামের বাড়ি পটুয়াখালীর কলাপাড়া থানার পাঁচজুনিয়া গ্রামে। সোহেলের নিখোঁজের ঘটনায় ৩ ডিসেম্বর শাহবাগ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করে করেছে তার পরিবার। র্যাব কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা সোহেলকে আটকের বিষয়টি অস্বীকার করেন।
থানায় করা সাধারণ ডায়েরির সূত্রে জানা গেছে, গত ১৮ অক্টোবর র্যাব পরিচয়ে অপহরণের শিকার হয়েছেন ৪১ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি নূর মোহাম্মদ হাজী ওরফে নূরু হাজী (৭৫)। হাজীর মেয়ে স্বপ্নার করা জিডিতে উল্লেখ করা হয়েছে গত ১৮ অক্টোবর রাত একটার দিকে সাদা পোশাকে ২০-২৫ জন যুবক সাভারের কাতলাপুর পালপাড়ার বাড়িতে ঢোকে। তারা নিজেদের র্যাব পরিচয় দিয়ে হাজীকে গাড়ি তুলে নেয়। এরপর থেকে হাজী এখনও নিখোঁজ। র্যাব ও পুলিশ তাকে ধরে নেয়ার বিষয়টি অস্বীকার করছে।
গত ৩ ডিসেম্বর শনিবার ঢাকার শ্যামলী এলাকা থেকে কয়েকজন যুবক হাজীর বড় মেয়ের জামাই আবদুল মান্নান ও ইকবাল হোসেন নামের দুই যুবককে ধরে নিয়ে যায়। এখন পর্যন্ত তাদের ধরে নেয়ার বিষয়টি স্বীকার করেনি র্যাব ও পুলিশ। পরিবারের বাসিন্দারা জানান, র্যাব পরিচয়ে শনিবার রাতে কয়েক যুবক হাজীর মেয়ের জামাই জাহাঙ্গীর আলমকে খোঁজ করে। তারা জাহাঙ্গীরকে না পেয়ে আবদুল মান্নান ও ইকবালকে তুলে নিয়ে যায়। এখন পর্যন্ত তারা নিখোঁজ রয়েছেন।
গত ৬ ডিসেম্বর ফেনী জেলার সোনাগাজী উপজেলার বাসিন্দা আবদুর রহিম মানিক বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনে সংবাদ সম্মেলনে জানান, পুলিশ পরিচয় দিয়ে গত ২৬ অক্টোবর তার ভাই সারোয়ার জাহান বাবুলকে ঢাকার ফকিরাপুল থেকে তুলে নেয়া হয়েছে। ঘটনার ৪৫ দিন পার হয়ে গেলেও তার কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। মানিক আরও জানান, তার ভাই ফেনী জেলার সোনাগাজী উপজেলা যুবলীগের নেতা। ঘটনার দিন সোনাগাজী থানায় জনৈক নুরুন্নবী লিটনের দায়ের করা একটি মামলায় হাইকোর্ট থেকে জামিন নেয়ার জন্য ঢাকায় আসে। ওইদিন রাত ৮টায় ফকিরাপুলে হোটেল আসরের সামনে থেকে পুলিশ পরিচয়ে কয়েক যুবক তাকে মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যায়। পরে ঢাকার বিভিন্ন থানা, র্যাব অফিস, ডিবি অফিসসহ বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ নিয়েও তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। গত ২৭ অক্টোবর মানিক একটি জিডি করেন এবং ২৯ অক্টোবর ৬ জনকে আসামি করে একটি মামলা করেন। মামলাটি এখন ডিবি পুলিশ তদন্ত করছে। কিন্তু পুলিশ এখনও বাবুলের কোনো হদিস বের করতে পারেনি। সংবাদ সম্মেলনে মানিক দাবি করেন, তার ভাই বেঁচে না থাকলে অন্তত তার লাশটি যেন পরিবারকে ফিরিয়ে দেয়া হয়।
ভাইকে বিদেশ যাওয়ার ফ্লাইটে তুলে দেয়ার জন্য ভোলা থেকে দিদার, বাহার ও জসিম নামে ৩ যুবক ঢাকায় আসে। ওইদিন রাতেই র্যাব পরিচয়ে তাদেরকে গুম করা হয়। ১৭ নভেম্বর এ বিষয়ে মতিঝিল থানায় একটি মামলা হয়েছে। তাদের মধ্যে জসিমের লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। দিদার ও বাহারের এখন পর্যন্ত কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। এখন মামলাটি তদন্ত করছে ডিবি পুলিশ।
এছাড়াও নভেম্বর মাসে মতিঝিল থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নেয়া হয়েছে আরিফ ও জুয়েল নামে দু’ব্যক্তিকে। জানা গেছে, তাদের মধ্যে আরিফ রামপুরার গ্রামীণ সৌন্দর্যের মালিক ও জুয়েল শতাব্দী সেন্টারের নিরাপত্তারক্ষী। আরিফ নিখোঁজ হওয়ার বিষয়ে ২০ নভেম্বর মতিঝিল থানায় একটি মামলা হয়েছে বলে জানা গেছে।
গত ২ অক্টোবর রাজধানীর দক্ষিণখান এলাকার গার্মেন্ট ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম অপহরণের শিকার হন। দু’মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। পুরাতন ৭৬/এ, পশ্চিম আশকোনা দক্ষিণখান এলাকার মরহুম আবুল হোসেন মিয়ার ছেলে সাইফুল ঘটনার দিন অফিসের কাজে বাসা থেকে গুলশানে যান। সন্ধ্যা ৭টায় গুলশানে থাকা অবস্থায় তার সঙ্গে কথা বলেন মা এবং বোনের সঙ্গে কথা বলেন সাইফুল। এরপর থেকে তার দুটি মোবাইল ফোন ০১৬৭৫০৪৪৮৯৯ ও ০১৮৯১৯৯৬৮১৯ বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। পরিবারের লোকজন জানতে পারছেন না সাইফুল বেঁচে আছে, না মরে গেছে।
৮ নভেম্বর রাজধানীর সূত্রাপুর থেকে অপহরণের শিকার হন সূত্রাপুর এলাকার বাসিন্দা ব্যবসায়ী মো. মমিন হোসেন (২৮)। ১০ নভেম্বর মমিনের স্বজনরা সূত্রাপুর থানায় জিডি করেন। মমিনের স্বজনরা জানান, ঘটনার দিন সকাল ১০টার দিকে গ্রামের বাড়ি যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নেয়ার সময় মমিনের মোবাইল নম্বরে (১৯১৩৭৪৯৫৫৮, ০১৮৩৪০৮৯৭৩৫) অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি ফোন করলে সে দ্রুত বাসা থেকে বের হয়ে যায়। এর কিছুক্ষণ পরই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তাকে গুম করা হয়। বাসা থেকে বের হওয়ার এক ঘণ্টা পর থেকেই মমিনের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। মমিনের ভগ্নিপতি মো. আলম জানান, কোরবানির ঈদের আগে মমিনের বিয়ের কাবিন হয়েছে। ঈদের তিন দিন পর অনুষ্ঠান হওয়ার কথা। মমিন নিজেই বিয়ের বাজার-সদাই করেছে। কোরবানির ঈদের পরদিন অজ্ঞাত মোবাইল থেকে তার নম্বরে ফোন আসার পর বেরিয়ে যায় সে। এখন পর্যন্ত সে নিখোঁজ। র্যাব ও পুলিশ মমিনের মোবাইল ফোনের কললিস্ট সংগ্রহ করেছে। কিন্তু তদন্তে অগ্রগতি দেখাচ্ছে না। মমিনের অপর এক আত্মীয় জানান, র্যাব-পুলিশই মমিনকে অপহরণ করেছে। তা না হলে কললিস্ট পাওয়ার পরও মমিনের বিষয়ে কোনো তদন্ত করেনি কেন।
২৪ অক্টোবর রাজশাহী মহানগরীর লক্ষ্মীপুর ভাটাপাড়া জামে মসজিদের ইমাম ও গোদাগাড়ীর পালপুর ধরমপুর মহাবিদ্যালয়ের প্রভাষক আমিনুল ইসলামকে র্যাব পরিচয়ে বাসা থেকে তুলে নেয়া হয়েছে। আমিনুল ইসলামের আত্মীয়রা জানান, ঘটনার দিন রাতে ভাটাপাড়ার বাসায় প্রবেশ করে র্যাব পরিচয়ে সাদা পোশাকে অজ্ঞাত কয়েক যুবক তাকে তুলে নেয়। এরপর থেকে তিনি নিখোঁজ রয়েছেন।
২২ সেপ্টেম্বর নিখোঁজ হয়েছেন রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থানাধীন মীরহাজিরবাগ এলাকা থেকে ৮৭ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপি সভাপতি কাজী আতাউর রহমান লিটু। এ ব্যাপারে ২৩ সেপ্টেম্বর লিটুর স্ত্রী রাশিদা বেগম যাত্রাবাড়ী থানায় একটি জিডি করেছেন। জিডিতে তিনি অভিযোগ করেছেন, ২২ সেপ্টেম্বর বিকাল পাঁচটা থেকে সাড়ে পাঁচটার মধ্যে আতাউর রহমান দয়াগঞ্জের দিকে যান। সেখানে সাদা পোশাকধারী কিছু লোক তাকে তুলে নিয়ে যায়। ওই জিডি পুলিশ তদন্ত করেনি বলে পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়।
৩১ জুলাই গেণ্ডারিয়ার দয়াগঞ্জ এলাকা থেকে মিজান, জুয়েল সর্দার, রাজীব নামে তিন যুবককে সাদা পোশাকে ডিবি পুলিশ পরিচয়ে আটক করা হয়। বেশ কিছু মানুষের সামনে তাদের আটক করে হাতে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যায়। এ ঘটনার ৫ দিন পর ৫ আগস্ট উদ্ধার হয় তিন যুবকের লাশ। গাজীপুরের পুবাইল এলাকা থেকে উদ্ধার হয় মিজান ও জুয়েল সর্দারের লাশ এবং মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান এলাকার ঢাকা-মাওয়া সড়ক থেকে উদ্ধার হয় রাজীবের লাশ।
৮ এপ্রিল বিকালে সূত্রাপুর থানাধীন ফরাশগঞ্জ ক্লাব কমিউনিটি সেন্টার এলাকা থেকে সাদা পোশাকে র্যাব পরিচয়ে তুলে নিয়ে যায় ব্যবসায়ী তাবির উদ্দিন আহমেদ রানাকে। বড় ভাইয়ের বৌভাত অনুষ্ঠান থেকে সাদা পোশাকে র্যাব পরিচয়ে তুলে নেয়ার পর এখন পর্যন্ত তার হদিস পাওয়া যায়নি। স্বজনরা র্যাবের বিভিন্ন ক্যাম্প ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে খোঁজ নিয়েছেন। কিন্তু কেউ তার সন্ধান দিতে পারেননি। সূত্রাপুর থানায় এ ব্যাপারে জিডি করা হয়েছে।
ডিবি পুলিশ পরিচয়ে ঢাকার মালিবাগ এলাকা থেকে বরিশালের উজিরপুরের বিএনপি নেতা হুমায়ুন খানকে তুলে নেয়া হয় গত বছরের ২৩ নভেম্বর। ঘটনার এক বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও হুমায়ুনের কোনো সন্ধান পায়নি তার পরিবার। র্যাব-পুলিশও তাকে উদ্ধারের বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি বলে দাবি করেছে তার পরিবার। গত বছর ২৩ নভেম্বর সকাল সাড়ে ৯টায় হুমায়ুন খান তার ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে ঢাকার সূত্রাপুরের ৪৫/ক, ঢালকানগর, ফরিদাবাদের বাসা থেকে ১০৯৩, মালিবাগ চৌধুরীপাড়ায় তার বন্ধু মফিজুলের বাসায় যান। মালিবাগ থেকে সাদা পোশাকের কয়েকজন লোক ডিবি পুলিশ পরিচয় দিয়ে হুমায়ুনকে গাড়িতে করে তুলে নিয়ে যায়। এরপর থেকে তিনি নিখোঁজ। তার ছোট ভাই মঞ্জু খান বাদী হয়ে প্রথমে জিডি এবং ১৩ ডিসেম্বর রামপুরা থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত হুমায়ুনের সন্ধান মেলেনি বা মামলারও অগ্রগতি হয়নি।
মানুষ গুম হয়ে যাওয়ার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান বলেন, মানবাধিকার কমিশনে বহু মানুষ এসে নালিশ করেন। কারও স্বামী, কারও ভাই, কারও বাবা, কারও ছেলেকে সাদা পোশাকধারী লোকেরা ধরে নিয়ে গুম করেছে। কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। মানবাধিকার কমিশন র্যাব-পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও শুধু বলা হয়—দেখছি স্যার। এর বেশি কিছু করারও থাকে না। তিনি জানান, পুলিশের ইউনিফর্ম ছাড়া গ্রেফতার বা আটক অভিযান বন্ধের জন্য সরকারের কাছে মানবাধিকার কমিশনের পক্ষ থেকে বার বার বলা হয়েছে। গ্রেফতার অভিযান কখনও সাদা পোশাকে হওয়া উচিত নয়। ইউনিফর্ম লাগিয়ে পুলিশের পোশাকে আটক বা গ্রেফতার অভিযান চালাতে হবে। এতে গ্রেফতার ব্যক্তির স্বজনরা জানতে পারেন কোন সংস্থা কী অভিযোগে তাকে গ্রেফতার করেছে।
পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) হাসান মাহমুদ খন্দকার বলেন, পুলিশ-র্যাবের নাম করে অপহরণের ঘটনা ঘটছে। তবে এসব ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জড়িত নয়। অপরাধীরাই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নাম ব্যবহার করছে। এটা অপরাধীদের একটা কৌশল। যতগুলো ঘটনা ঘটেছে, তার তদন্ত করা হচ্ছে। এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি ঘটনা তদন্ত করা হয়েছে। তাতে দেখা যাচ্ছে, র্যাব-পুলিশ এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত নয়। তিনি আরও বলেন, আসামি গ্রেফতারের বিষয়ে হাইকোর্টের কিছু নির্দেশনা রয়েছে। তারা স্ব-স্ব ইউনিটগুলোকে ওই নির্দেশনা মেনে ইউনিফর্ম পরে, ক্ষেত্রবিশেষে নিজেদের পরিচয়পত্র দেখিয়ে আসামি গ্রেফতার করার জন্য বলেছেন।
Subscribe to:
Posts (Atom)

